ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
উড়িষ্যার ময়ূরভঞ্জ জেলার রায়বংপুরের নিকটবর্তী ডাণ্ডবোস গ্রামে (ডাথরডি) চুনু মুর্ম্মু জন্ম লাভ করেন। সালটা ১৯০৫ খ্রি:, বৈশাখী পূণির্মার দিন চুনুর জন্ম হয়। পিতা ন¨লাল ও মাতা ছিলেন সলমা।
শৈশব থেকে চুনু ধীর স্থির প্রকৃতির ছিলেন। বয়স যখন বাড়তে লাগল তখন চুনুকে ভর্তি করা হয় তাঁর গ্রাম থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গাম্ভারিয়া স্কুলে--প্রথম শ্রেণিতে। তখনকার দিন পথঘাট ভঙ্গনাকীর্ণ ছিল। স্বভাবতই সহপাঠীদেরকে নিয়ে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে স্কুলে যেতে হতো। সাঁওতালী মাতৃভাষা হওয়া সত্ত্বেও তখন উড়িয়া ভাষায় পড়াশুনা করতে হতো। বালক চুনু কিন্তু শিক্ষকদের উড়িয়া ভাষায় শিক্ষাদান বুঝতে পারতেন না। মনে মনে তিনি অবাক হতেন। উড়িয়া ভাষায় পড়া তাঁর কাছে দুর্বোধ্য মনে হতো। কারণ মাতৃকোলের ভাষা ছিল সাঁওতালী।
মামা সাওনা মুর্ম্মু ছিলেন প্রায় তার সমবয়সী-- তিনি মাঝে মাঝে পড়াশুনার বিষয়ে উৎসাহ দিতেন। তিনি বলতেন নিজের ভাষায় পড়াশুনার ব্যবস্থা নেই, প্রথমে উড়িয়া ভাষায় পড়াশুনা করতে হবে। কারণ তাঁর ভাষার অক্ষর নেই। এই বেদনা সাঁওতাল বালক চুনুকে কৌতূহলী করে তুলেছিল। প্রাথমিক স্কুলে শিক্ষা শেষ হওয়ার পর চুনু দূরবর্তী বহড়া এম.ই স্কুলে ভর্তি হন। এম.ই স্কুলে পড়া চলাকালীন উড়িয়া ভাষায় দখল লাভ করেন। বালক চুনু সহপাঠীদের সাথে খেলাধূলা ছাড়াও নানা ধরণের ছবি, নক্সা ও আলপনা পট আঁকতেন (যা বর্তমানে অনেক সাঁওতাল রমণীরা পল্লীর বাড়ির দেওয়ালে করে থাকেন)।
কিশোর চুনু তখন ইতিহাসের পাতায় আর্য ও অনার্যের কথা জানতে পারছেন। শ্রেণি কক্ষে শিক্ষকরা অনার্যের ব্যাখ্যা করছেন। অনার্য বলতে সাঁওতাল, কোল, ভীল, মুন্ডা, অসভ্য অন্ত্যজ শ্রেণী। চুনু কিন্তু সেদিন রক্ষণশীল শিক্ষকদের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারে নি। সেদিনের সেই বিদ্রুপাত্মক উক্তি চুনুকে ব্যথিত ও মর্মাহত করেছিল। নিজের জাতি সম্পর্কে মামা সাওনা মুর্ম্মুকে জিজ্ঞেস করেন--‘‘মামা আমরা কি অসভ্য জাতি?’’ উত্তরে সাওনা মামা বলেন--‘‘তুমি বড়ো হও--নিজেই এর উত্তর খুঁজে পাবে’’--
১৯২৪ খ্রি: চুনু বারিপদা স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেন। নিজস্ব অক্ষর না থাকায় মাতৃভাষার মাধ্যমে লেখাপড়ার ব্যবস্থা নেই। একটা জাতির নিজস্ব অক্ষর বা লিপি না থাকলে জাতির সর্বাঙ্গীণ বিকাশ বা উন্নতি ঘটে না--এই নির্মম সত্যটাকে রঘুনাথ মুর্ম্মু (চুনু) প্রাণ দিয়ে অনুভব করেছিলেন। লিপি ছাড়া জাতির ভাষা ও সাহিত্যে বিস্তূত লাভ করে না। ভাষা জনগোষ্ঠী তথা জাতির মধ্যে ঐক্য তৈরী করে।
তাই অক্লান্ত পরিশ্রম করে রঘুনাথ মুর্ম্মু ১৯২৫ সালে ‘অলচিকি’ লিপি উদ্ভাবন করেন। এই অক্ষর তৈরীর কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি সমাজের সম্মুখে বলেন--‘‘সমস্ত ভাষার নিজস্ব লিপি বা অক্ষর আছে তাই সাঁওতালী ভাষার নিজস্ব লিপি একান্তই দরকার।’’ ১৯৩৮ খ্রি: পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্ম্মু ‘অলচিকি’ প্রচারের উদ্দেশ্যে ছাপাকল তৈরী করেছিলেন। কাঠের তৈরী এই ছাপাকল তৎকালীন উড়িষ্যার সরকারী মহলে প্রশংসা লাভ করে এবং ১৯৩৯ খ্রি: বারিপদায় প্রদর্শনীতে স্থান পায়। ‘অলচিকি’ প্রসারের উদ্দেশ্যে তিনি উড়িষ্যায়, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও অধুনা ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন স্থানে প্রচার ও জনসভায় যোগ দেন। এটাও শোনা যায় গুরুগমকে রঘুনাথ পঃবঃ বর্ধমান ও হুগলী জেলাতেও সফরে এসেছিলেন।
পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্ম্মু সাঁওতাল বুদ্ধিজীবি মহলে ‘অলগুরু’ নামে খ্যাত। তিনি মহান শিল্পী ও মনীষী ছিলেন। তাঁর মহান আবিষ্কার ভারতের সাঁওতাল জাতি তথা পৃথিবীর সাঁওতাল ভাষাপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে মহামূল্যবান সম্পদ। তিনি অনুভব করেছেন ভাষাকে গতিময় করতে হলে লিপির দরকার। লিপি ছাড়া ভাষার চর্চা সম্ভব নয়। অতএব লিপি ও ভাষা পরিপূরক। তিনি লিপি আবিষ্কার করে ক্ষান্ত হননি। তিনি সাঁওতালী ভাষা শিক্ষা বিষয়ক বই ও সমাজ সচেতনমূলক বই লিখে গেছেন। পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্ম্মু তাঁর রচনাবলীর মাধ্যমে দেশবাসীকে জাতীয়তাবোধ, ঐক্যবোধ অটুট রাখার কথা বলেছেন। তিনি প্রায় ১৭ (সতের)টি বই রচনা করে গেছেন। আলোচনা প্রসঙ্গে কয়েকটি উদ্ধৃতি দেওয়া হল--
‘‘জানাম আয়োয় রেঙ্গেজ রেঁহ
উনি গে হাঃ রাওয়া
জানাম বড় দ নিধান রেঁহ
অনা তেগে মারাং আ’’--
বঙ্গানুবাদ : ‘‘জন্মদাত্রী যতই দরিদ্র হোক না কেন তিনিই সন্তানকে সযত্নে লালন পালন করেন। মাতৃভাষা যতই অনুন্নত ও নিঃস্ব হোক না কেন মাতৃভাষার মাধ্যমেই সার্বিক উন্নতি সম্ভব’’--
এর থেকে বুঝতে পারি পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্ম্মুর বাণী কালজয়ী ও চিরন্তন। আমরা বলতে পারি পণ্ডিত মাতৃভাষার অকৃত্রিম সাধক ও উপাসক ছিলেন।
‘‘অল মেনাঃ তামা অল এম্ আৎ লেরে
বড় মেনাঃ তামা রড্ এম্ আৎ লে
ধরম মেনাঃ তামা ধরম্ এম্ আৎ লেরে
আমহঁ মেনাম্ আম হঁম্ আদঃ’’--
বঙ্গানুবাদ : ‘‘আছে তোমার বর্ণমালা আছে তোমার ভাষা, আছে তোমার ধর্ম জীবনেরই আশা’’-- গুরুমকে।
এই মহান বাণী জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকল দেশে প্রযোজ্য। এর থেকে বুঝতে পারি তিনি সমাজ সচেতক ও সমাজ সংস্কারক ছিলেন। তিনি বিশ্বের দরবারে সাঁওতালী ভাষা ও সাঁওতাল সমাজকে মর্যাদার আসনে উন্নীত করেছেন। সাঁওতাল ভাষা পৃথিবীর যেকোন ভাষার সমান আসনে উন্নীত হতে পারে।
রঘুনাথ মুর্ম্মু সাঁওতালী লিপি অলচিকি প্রসারে সারাজীবন অক্লান্ত পরিশ্রম ও সংগ্রাম করে গেছেন। তাঁর আবিষ্কৃত লিপির সমর্থন আন্দোলন ও জনমত তৈরী হয়। একমাত্র পঃবঃ সরকার ১৯৭৯ সালে তাঁর ‘অলচিকি’ লিপিকে প্রথমে স্বীকৃতি দেন। ১৯৭৯ সালে ১৭ নভেম্বর তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী মাননীয় শ্রী জ্যোতি বসু পণ্ডিত মুর্ম্মুকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করেন পুরুলিয়ার কেঁ¨বনা ময়দানে।
পরবর্তীকালে রাজ্য সরকারের দাবী ও ভারতের সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত দাবী ছিল ভারতের সংবিধানের ৮ম তপশীলে সাঁওতালী ভাষার স্বীকৃতি। তদানীন্তন ভারত সরকারের পদক্ষেপে ২০০৩ সালে ২২ ডিসেম্বর ৮ম তপশীলে সাঁওতালী ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বর্তমানে প্রায় ১ (এক) কোটি সাঁওতাল জনগোষ্ঠী মানুষ ভারতে বসবাস করেন। ভাষাকে যদি সমৃদ্ধ করতে হয় তাহলে ভাষা চর্চার অগ্রগতি জরুরী। ভাষা প্রেমিক সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবি, জনসাধারণের সদর্থক ভূমিকা নিতে হবে। তবেই রঘুনাথ মুর্ম্মুর লক্ষ্য ও আদর্শ পূরণ হবে। বর্তমানে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে রঘুনাথ মুর্ম্মুর জীবনী ও রচনাবলীর প্রকাশনার ব্যবস্থা নেওয়া হচেছ। আমরা আশা করব আগামী দিনে রঘুনাথ মুর্ম্মুর বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা ও গবেষণা হবে।
পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্ম্মু ১৯৮২ সালে ১ ফেব্রুয়ারী নিজ গ্রামে প্রয়াত হন। অগণিত গুণমুগ্ধ ও ভক্তদের উপস্থিতি গুরুগম্কের অন্তিম যাত্রা সম্পন্ন হয়। সেদিন গুরুকে হাজার হাজার সাঁওতালরা অশ্রু জলে বিদায় জানায়।
তথ্যসূত্র : সাঁওতালী লিপির স্রষ্টা--মতিলাল কিস্কু
International Seminar on Santal, Language & Leterature Orgd. Or B.C.W. Dept. Govt. W,B.
কিশোর জগৎ, বর্ষ-২৮, সংখ্যা-১২, বিশেষ শারদ সংখ্যা, ১ অক্টোবর ২০০৬