ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
শুক্লা দ্বিতীয়ার চাঁদ অনেকক্ষণ ডুবে গেছে, তবু আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা তারার আলো মেখে আকাশ পাখিটা মাঝে মাঝেই থেকে থেকে ডাকছিল। পাখির গলায় এমন সুর সন্টে কোন দিন শোনেনি। মাঝরাতে তার ঘুম ভেঙে গেছে; আর সেই থেকেই সে ভাবছিল এটা কেমন পাখি?
অনেক পাখির ডাক, তার শোনা আছে, বইয়ের ছবি দেখে। গাছের পাখি দেখে, বাবা, দাদা, দিদির কাছে সে অনেক পাখি চিনেছে। তাদের ডাক শুনে সে বলে দিতেও পারে পাখিটার নাম!
কিন্তু আজ; তার শোনা, জানা কোন পাখির ডাকের সঙ্গেই মিলছে না পাখিটার গলার সুর, এমন মিস্টি, অথচ গম্ভীর, ভয় ভয় পাওয়া আওয়াজটা!
সন্টে ভাবছিল পাখিটার কি নাম রাখা যায়-- বনপাখি... রাতপাখি... আলোপাখি... আঁধারপাখি...? আর তখনই তার মনের মধ্যে কে যেন বলে গেল-- ‘ও খোকা; অতো ভাবছ কেন?’ আমার নাম হলো গিয়ে--‘আকাশ পাখি!’
সন্টে স্তব্ধ হয়ে গেল আনন্দে। সে মনে মনেই বলে ফেলল--‘ও পাখি, ও আকাশ পাখি তোমাকে তো দেখিনি কোনদিন। কোন রাতেও শুনিনি তোমার গলার সুর; কোথায় থাকো তুমি?’
তখনই আবার সেই পাখিটার ডাক শোনা গেল। পাখিটা এবার সুরে সুরে যেন বলছে— ‘আমি আকাশে থাকি, আমি আকাশে থাকি। আমি অনেক দূরের থেকে আসি, তাই সব সময় দেখতে পাও না। শীতের পাখিরা যেমন শীতে আসে; বসন্তের পাখিরা, গ্রীষ্মের পাখিরা, বর্ষার পাখিরা যেমন করে আসে, আমিও তেমন করে আসি। তবে সবাই আমায় দেখতে পায় না, সকলে আমার গানও শুনতে পায় না। তুমি বড়ো ভালো ছেলে, তাই তোমায় গান শোনাচিছ।’
কথাগুলো যেন অনায়াসে সন্টের প্রাণের মধ্যে, মনের মধ্যে, কানের মধ্যে ঢুকে পড়ছিল। নিস্তেজ হয়ে, নিশ্চেষ্ট হয়ে কেমন এক আচ্ছন্ন হয়ে আকাশ পাখির গান, তার কথা শুনতে শুনতে ঘরের বাইরে চলে এলো। সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে সে উঠে এল ছাদে। একতলা ছাদের উত্তর গায়ে প্রীতমদের পিয়ারা গাছটার দিকে সে তাকাল, পূব দিকে কুলগাছটার দিকেও সে তাকাল, দক্ষিণে বংশীবদনের মন্দিরের পাশে চাঁপা গাছটার দিকে, পশ্চিমে নন্দীবুড়ির বারোমেসে আমগাছটার দিকেও সে তাকালো। কই কোথায় সেই পাখি? কোন পাখিই তো নেই; কোন পাখিই তো নেই; কোন পাখিই তো ডাকছে না!
সন্টে ভাবছিল সবই কি মনের ভুল! পাখির ডাক, সেটাও কি শোনার ভুল! কুয়াশা জড়ানো আকাশে যেটুকু আলো তখনো ছিল তারা বলল--‘সন্টে ভালো করে দেখো’; যে ঘন অন্ধকার ছিল তারাও বলল--‘সন্টে, ভালো করে দেখো।’
এবার সন্টের চোখের সামনে একটু আলো-ছায়ার নাচন, একটু বাতাসের কম্পন, একটা মৃদু ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ! আর তারপর সেই সুর; সেই আকাশ পাখির গান শোনা গেল!
সেই আলো ছায়ায় সন্টে দেখল এক স্বর্গের পাখি হাওয়ায় ভাসছে। কি তার রূপ; কি তার জ্যোতি!...
সন্টেকে অবাক করে আকাশ পাখি বলল--‘সন্টে, আমার গান সেই শুনতে পায়, মনে যার ভালবাসা আছে। আমায় দেখতে পায় সে-যে সকলকে ভালবাসে!’...
সন্টে বলল--‘আকাশ পাখি তুমি বড়ো ভালো! আমায় নিয়ে যাবে তোমার দেশে?’
আকাশ পাখি এবার হাসতে হাসতে বলল--‘না... না...না...; আমার সঙ্গে কেউ যেতে পারবে না। আমি আলোর পাখি, আমি আকাশ পাখি! আমি তোমায় ভালবাসি; তাই তোমায় দেখা দিয়েছি। আমি এখন চলে যাচিছ, আবার আমি তোমার কাছে আসবো।’...
সন্টের সমুখ থেকে আকাশ পাখি ক্রমশঃ মিলিয়ে গেল মহাশূন্যে। সন্টে কান্না ভেজা গলায় বলে উঠল--‘ও আকাশ পাখি... ও আকাশ পাখি; আমায় নিয়ে যাও; আমি যাবো তোমার সঙ্গে, আমায় নিয়ে যাও!’...
সন্টের মা, ঘুমের ঘোরে সন্টেকে কাঁদতে দেখে তার মাথায়, গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে লাগলেন--‘কী হয়েছে রে? স্বপ্ন দেখছিলিস বুঝি?’...