ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
সন্ধ্যে হয়ে হয়ে আসছে। এই সময়টা দীপালির মোটেই ভাল লাগে না। সব ঘর আলো করে লাইট জ্বলে আর তাদের সন্ধ্যে পেরিয়ে লম্ফ জ্বলে। একটা লম্ফ মোটেই তাদের ঘরটাকে আলোময় করে তুলতে পারে না। তাই দীপালি রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়-- সন্ধ্যের আগেই পথবাতি সব জ্বেলে দিয়ে যায়; পথবাতির আলো কোথায় কতটা পড়ে সব দীপালির জানা--এছাড়া কোন বাড়ির জানলা দিয়ে কতটা আলো আসে--কোন বাড়ির বাগানের কোন কোণাটি অন্ধকারে ঝুপসি হয়ে থাকে--তাও দীপালির জানা। অবশ্য দীপালির এটাও জানা কতক্ষণে তার মায়ের ভাত হয়ে যাবে। সারা রাস্তা এক্কা দোক্কা একা একা খেলে হা-ক্লান্ত হয়ে দীপালি যখন ঘরে ঢোকে তখন সে জানে মায়ের ভাতের ফ্যান ঝরানো হয়ে গেছে-- ঠাকুরকে সন্ধ্যা দেখানো হয়ে গেছে, মা কোন কিছু ভাজা চাপিয়েছে সেটি গ্যাসে। অবশ্য কোন কোন দিন মা বলে--‘‘দীপা ঠাকুরকে আরতি দেখিয়ে শয়ন দিয়ে দে। প্রতিজন ঠাকুরকে আলাদা আলাদা করে আরতি করবি।’’ দীপার বয়েই গেছে সর্বমোট পাঁচজন ঠাকুরকে আলাদা করে আরতি করতে। সে একসঙ্গে সবাইকে আলোটা দেখিয়ে আরতি সারে--শয়নটা অবশ্য প্রত্যেককে আলাদা করে দিতে হয়। দীপালির মোট লাভ ঠাকুরের প্রসাদ চারটে নকুলদানা।
মায়ের রান্না হয়ে এলে মা চা বানায়। দুটো বাটিতে করে চা আর একটা বাটিতে করে মুড়ি নিয়ে মা ডাক দেয়--‘‘দীপা খাবি আয়।’’ দীপা এতক্ষণ কোন নির্দিষ্ট কাজ না পেয়ে অস্থির ভাবে ঘোরাফেরা করছিল। চা খাবার ডাক পেয়ে একটা নির্দিষ্ট কাজ পেল। মুড়ির বাটি থেকে একটা একটা মুড়ি নিয়ে দাঁতের মত ঠোঁটের চারপাশে লাগালো--জানিনা কতটা কিম্ভুত লাগছিল--মা কৃত্রিম শাসনের সুরে হাত তুলে কৃত্রিম মারের ভঙ্গী করতেই দীপা মুড়িগুলো মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। এরপর চায়ের বাটিতে চুমুক দিতেই মনটা খুশি হয়ে উঠল। দীপা একবার ঘড়ির দিকে তাকাল--সাতটা বেজে পঁয়তিরিশ। মা দ্রুত খাওয়া শেষ করে দীপার উদ্দেশ্যে বলল, ‘‘দীপা বই-খাতা বের কর?’’ বই বলতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় রচিত--‘বর্ণপরিচয়’ বইটির প্রথমভাগ আর খাতা-খাতা কই? একখানা শেলেট--সেই শেলেটে পেন্সিল দিয়ে লেখা। সেই পেন্সিল ভাঙতে ভাঙতে এতটুকু টুকরোতে পৌঁছেছে। বর্ণপরিচয়ের প্রথম পাতাটা পার হতে হতে বাবার গলার গান শোনা গেল। চালু হিন্দী সিনেমার গান জড়ানো গলায় গাইতে গাইতে বাবা ঘরে ঢুকল। ঘরে ঢুকেও বাবার গান থামেনি। মা কিঞ্চিৎ উষ্মার স্বরে বলল--‘‘দেখছ না মেয়েটা পড়ছে।’’ বাবা তাচিছল্যের সুরে বলল-- ‘‘ইঃ খুব তো পড়ছে!’’ মা বাবার কথার কোন প্রত্যুত্তর না করে শব্দগুলো বানান করে বলতে শুরু করল--মার বলা বানানগুলো বলতে শুরু করল দীপা। মা একবার--দীপা দুবার। এমনভাবে চলছে। বাবা বাগবিতন্ডা চালাবার কোন সুযোগ না পেয়ে রাস্তার ধুলো-কাদা মাখা পায়ে চৌকির বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল--শুয়ে পড়ে বাবার গান থামে নি--ভলিউম কমেছে। মা বাবার দিকে পিছন ফিরে বসে দীপাকে বানান পড়াতে লাগল--‘অচল’, ‘অধম’, ‘আলয়’, ‘ইতর’.... শব্দগুলিকে বার বার বলে যাওয়া ছাড়া দীপার আর কোন কাজ ছিল না।
ঘরে সাজাবার মত আর কোন জিনিস না থাকায়-- মা চৌকির বিছানাটাকে গুছিয়ে দেখনদারি করে রাখতে চায়। বিছানার চাদর একটু কোঁচকানো দেখলে টেনে সোজা করে--সেই বিছানায় ধুলো-কাদা--মা কোনমতেই মেনে নেবে না। ঠিক তাই। রুক্ষ্মস্বরে বলল--‘‘উঠে পড় ভাত বেড়ে দিচ্ছি--বাইরে থেকে এসে বিছানায় গড়াগড়ি না দিলেই নয়। বাবা বোধহয় প্রথমে মায়ের রুক্ষ্মতার কারণ ধরতে পারে নি। রুক্ষ্মতার কারণ অপরিচছন্নতা ধরতে পেরে--শোওয়া থেকে উঠে বাবা বারান্দার তোলা জল ঝপাস ঝপাস করে খানিক পায়ে পায়ে ঢেলে--গামছায় পা রগড়ে মুছতে শুরু করল। মা ডাক দিল--‘‘দীপা তুইও খেতে বসে যা।’’ দীপা নিজের থালাটা নামিয়ে মার দিকে এগিয়ে দিল। মা দীপার থালায় ভাত দিতে থাকলো--দীপা বাবার জন্য বাড়া ভাতের দিকে তাকিয়ে দেখল--ভাত আর ঢেঁড়শের ঝোল। দেখে দীপার চোখের কোণে জল এসে গেল। মাকে সে জিজ্ঞেস করল--‘‘আলু সিদ্ধ করনি।’’ মার আগে থেকেই রাগ হয়ে ছিল--দীপার ভাবভঙ্গী দেখে সেই রাগ আরও বেড়ে গেল--সামনে যে বড় বাটিতে জল রেখে--থালাগুলো জল বোলাচ্ছিল ভাত বাড়ার আগে--সে বাটিটাকে ঠুকে নামিয়ে বলল--‘‘দাঁড়াও ডিম ভাজছি’’--মায়ের বিরক্তির সঙ্গে ডিম ভাজার দিকে তাকিয়েছিল--ডিমটা গোল করে ভেজে মা একটা থালার উপর রেখে আধা-আধি কাটল--তারপর অর্ধেকটা ডিমভাজা দীপালির থালায় তুলে দিয়ে-- বাকী অর্ধেকটা দুভাগ করে কাটল। দীপালি বুঝতে পারল বাকী দুটুকরো মা আর বাবা নেবে। মনটা একটু খারাপ লাগলেও ডিমভাজার সুগন্ধে তার মন ভরে উঠল। দীপালি থালাটা কাছে টেনে নিল--এখন ঢেঁড়সের তরকারী আর এতটা অসহনীয় মনে হল না। সবার শেষে মা যখন থালায় ভাত ঢালছে তখন হাঁড়িটা চেঁছে ভাত ঢালল। দীপা মায়ের মুখের দিকে হাসি হাসি মুখে তাকাল--দীপার বাবা এমন ছড়িয়ে ছিটিয়ে খাচিছল যে তার দিকে তাকানই যাচ্ছিল না। দীপা তাড়াতাড়ি বাবার বিছানা করে দিল--মশারি টাঙানোটা দীপা এখনও রপ্ত করতে পারে নি--তাই কোনদিন মা, কোনদিন বাবা মশারি টাঙিয়ে নেয়। বিছানা করে শুতে না শুতেই বাবার নাকডাকা শুরু হল। দীপালি বিছানায় গিয়ে শোওয়ার পর আর দু-চারটে ঘরের কাজ সেরে মা শুতে এল। শোওয়ার আগে মা ফুঁ দিয়ে লম্ফটা নিবিয়ে এল। গোটা ঘর অন্ধকার--অন্ধকার ঘরে মশার পিঁ পিঁ ছাড়া কোন আওয়াজ নেই--কোন ছবিও মনে ভাসে না--একটু পরেই দীপালির দুচোখে নেমে এল ঘুম।
এমনিভাবেই দিন যায়। দীপালি পাড়ার ইস্কুলে ভর্তি হয়। মায়ের সঙ্গে গিয়ে নাম লিখিয়ে আসে--দীপালি কর্মকার--বই পায় তিনটি, সহজপাঠ (১ম ভাগ), কিশলয়, নবগণিত মুকুল। বুকে জড়িয়ে বই তিনটি বাড়ি নিয়ে আসে। এখন আর সর্বদা সময় কাটানোর জন্য বাইরে যেতে হয় না--ঘরের মেঝেয় পা ছড়িয়ে বই তিনটে খুলে বসে। মা বই রাখার জন্য একটা অ্যালুমিনিয়ামের সুটকেস কিনে দিয়েছে--তাতে শেলেটটা ধরে না। দীপালি হাতে ঝুলিয়ে সুটকেসটা দিয়ে বুকে আঁকড়ে রাখে শেলেটটা। তার বুক জুড়ে ছড়িয়ে থাকে সহজপাঠ। মনে মনে আওড়ায়--‘‘আলো হয়/গেল ভয়, চারিদিক/ঝিকমিক, বায়ু বয়/বনময়, বায়ু মানে বাতাস, কী সুন্দর বাতাস বয়, দীপার গায়ে এসে লাগে, দীপার মন ভাল লাগায় ভরে যায়।
স্কুলে দিদিমণি, মাস্টারমশাইরা যা বলেন দীপালি মন দিয়ে শোনে, অঙ্ক শেখে, মহাপুরুষদের গল্প শোনে--আরও কত কী? দিমিমণিদের বলা মহাপুরুষদের বাণী শুনে মনে রাখার চেষ্টা করে। বড়দিদিমণি বলেছেন--মহাপুরুষদের বাণী এখন না বুঝলেও পরে পরে জীবন দিয়ে অনুভব করবে।
এখন শীত পেরিয়ে বসন্তকাল। গাছে গাছে ফুল ফুটেছে--কচি কচি নবীন পাতায় বড় বড় গাছগুলো যেন সেজে উঠেছে। দীপালিদের ক্লাসের পড়া অনেকটা এগিয়েছে। একার-আকার ছেড়ে তারা এখন ই-কার পাতা পড়ছে। কিশলয় পড়তে আর ভাল লাগে না এখন। তবে ‘সহজপাঠে’র গদ্য-পদ্য দুই-ই তার প্রাণ ছুঁয়ে যায়। পড়া ছাড়াও সে ওই কবিতাগুলি অনুচ্চ স্বরে পাঠ করে। তার মন প্রাণ--দুইই ভরে যায়। বারান্দায় দু বালতি জল তোলার ফাঁকে ফাঁকে সে নিজের মনে পড়ে যায়--‘‘রাম বনে ফুল পাড়ে। গায়ে তার লাল শাল। হাতে তার সাজি। বেল ফুল তোলে। জবা ফুল তোলে। জলে আছে নীল ফুল।’’ দীপালির কী আর কাজের শেষ আছে। বাবাকে ঘুম থেকে ডেকে জাগিয়ে দিয়ে স্কুলের জন্য প্রস্তুতি সারতে যায়। ততক্ষণে মা একটা বড় বাটিতে চা ঢেলে দিয়ে কাজে বেরিয়ে যায়।
এমনি একদিন মা কাজে বেরিয়ে গেছে। দীপালি চায়ের বাটিতে চা দুভাগ করে দুটো গতদিনের বাসী রুটি বাবার জন্য রেখে নিজের ভাগেরটা নিয়ে খেতে বসল। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখে ছ’টা চল্লিশ। আরিব্বাস এখনও কুড়ি মিনিট বাকী আছে স্কুল বসতে। দীপালি চট করে ভেবে নিল--‘‘মায়ের সঙ্গে একবার দেখা করে এলে হয়। দীপালি তার চলার বেগে পাঁচ মিনিটের পথ তিন মিনিটে সেরে গার্গী মাসীমণির বাড়ির গেটের সামনে পৌঁছাল। গেট খুলে সামান্য ঘাস জমি পেরিয়ে কলিংবেল টিপল। কলিংবেলে সুমধুর জলতরঙ্গ বেজে উঠল। দীপালি জানে তার মায়ের আসতে এখনও মিনিট দুয়েক দেরী। ও ভাল করে তাকিয়ে দেখল গার্গী মাসীমণির বাইরের বারান্দাটা বড় বড় আটটা খোপে কাটা--ঢালা মোজাইক বিছানো। বারান্দায় শেলেট সুটকেশ নামিয়ে রেখে লাফিয়ে লাফিয়ে খেলতে লাগল--‘‘কাল ছিল ডাল খালি/আজ ফুলে যায় ভরে, বল দেখি তুই মালি হয় সে কেমন করে।’’
দরজা খোলার শব্দ পেয়ে দীপালি থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু একি! দরজায় মাও নয়, গার্গী মাসীও নয়। তবে কে? সাদা শাড়ি--এক ইঞ্চি চওড়া আকাশী পাড়-- নীল আকাশের মত নিস্তরঙ্গ। গোটা মেঝে সাদা। সাদা রঙের সঙ্গে রঙ মেলাতে তাঁর মাথার চুল সব সাদা। কালোর চিহ্নমাত্র নেই। দরজা খুলে তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেন--‘‘তুমি কে মেয়ে?’’ ‘‘আমার মায়ের নাম শুক্লা। গার্গী মাসীমণি আমায় চেনেন।’’ ‘‘তাই নাকি? এস, এস ঘরে এস।’’ বলতে বলতে ভদ্রমহিলা ঘরের দরজা খুলে--‘‘গার্গী গার্গী’’ ডাক দিলেন। মায়ের ডাক শুনে গার্গী এবং শুক্লা দুজনেই উপস্থিত। মা সরাসরি বললেন--‘‘গার্গী, শুক্লা দুজনেই শোন, এখন তো আমার সব ফাঁকা--এই মেয়েটিকে আমার চাই।’’ শুক্লা তোমার মেয়েকে আমি শান্তিনিকেতন নিয়ে যাব--আমার সঙ্গে থাকবে। আমাকে ঠাকুমা বা ভালমা যা খুশি বলবে। আমি ওকে পাঠভবনে প্রথম বিভাগে ভর্তি করে দেব। ও গান গাইবে, নাচ করবে। সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হয়ে উঠবে প্রাণের আরাম আর মনের আনন্দে। তাই বলে ভেব না যে ও একদম তোমার কাছে আসবে না। ও আসবে ছুটি ছাটায়। গার্গীর সঙ্গে ও আসবে বা তুমিও দু-এক দিন গিয়ে থেকে আসতে পার। কি রাজী?’’
শুক্লার দুচোখে জল। অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে সে বলল, ‘‘আমার মেয়ের যে এত সৌভাগ্য হবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি।’’ শুক্লা মেয়েকে হাত ধরে টান দিল-- ‘‘ঠাকুমাকে প্রণাম কর।’’ বুকের কাছে টেনে নিয়ে ভালোমা বললেন--‘‘শুক্লা, মেয়ের কী নাম রেখেছ?’’ এবার দীপাই বলল--‘‘দীপালি কর্মকার।’’ ‘‘নাঃ, নাঃ--দীপালি বড্ড কমন নাম। আজ থেকে আমি ওর নাম দিলাম-- ‘‘দীপাবলি কর্মকার’’--দীপা বা দীপালি নয় দীপাবলী কর্মকার।’