ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
২২.০২.২০২৬, বর্ধমান শহরের ভাতছালায় শিশু নিকেতন বিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে কলকাতার স্কাই ভিউয়ারস ক্লাবের তত্ত্বাবধানে একটি জ্যোতিবির্জ্ঞান এবং বিজ্ঞান মনস্কতা বিষয়ক আলোচনা সভা ও টেলিস্কোপের সাহায্যে আকাশ পর্যবেক্ষণের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে শিশু নিকেতন এবং বিভিন্ন বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক-অভিভাবিকারা উপস্থিত ছিলেন। বনপাশ কামারপাড়া থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কিশোর বাহিনীর সংগঠকরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও এসেছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অরিন্দম কোনার, কালনা কলেজের পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ড. দেবাশিস ভট্টাচার্য, বর্ধমান বিবেকানন্দ মহাবিদ্যালয়ের প্রাক্তন রসায়নের অধ্যাপক সত্যদর্শন দত্ত, শিশু নিকেতনের পরিচালন সমিতির সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘর, শিশু নিকেতন বিজ্ঞান চর্চা কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড. অরবিন্দ দাশের মতো বিভিন্ন বিজ্ঞান মনস্ক বিশিষ্ট ব্যক্তি। এই মনোজ্ঞ অনুষ্ঠানে ‘‘মহাকাশের রহস্য’’ এবং পৃথিবীর ইতিহাসে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের অবদান সম্পর্কে স্লাইড শো সহযোগে বক্তব্য রাখেন আমন্ত্রিত বক্তা ডাঃ শঙ্কর কুমার নাথ।
ডাঃ নাথ সিনিয়র অঙ্কোলজিস্ট হিসেবে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করলেও পেশাদার পরিচয়ের বাইরে তিনি একজন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী, সুলেখক, সুগায়ক, সুবক্তা এবং বিজ্ঞান মনস্কতা প্রচারের কাজে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত, সমাজ সেবামূলক কাজে নিবেদিত প্রাণ এক ব্যক্তিত্ব। বাংলায় তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ ‘‘কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের গোড়ার কথা ও পণ্ডিত মধুসূদন গুপ্ত’’ গ্রন্থের জন্য ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান ‘‘রবীন্দ্র পুরস্কার’’ অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি পেয়েছেন রাধানাথ শিকদার, বেণীমাধব বড়ুয়া ও জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ পুরস্কারের মতো বেশ কিছু সম্মানজনক পুরস্কার। ‘‘ক্যানসার প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাস’’ তাঁর একটি মূল্যবান গ্রন্থ। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি নিয়মিত আমন্ত্রিত বক্তা হিসাবে বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা, শিশু নিকেতনের পরিচালন সমিতির সভাপতি ধীরেন্দ্রনাথ সুরের অনুরোধে ডাঃ নাথ অনুষ্ঠানের সূচনা করেন একটি দেশাত্মবোধক রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাধ্যমে। গানটি হল, সার্থক জনম আমার আমি জন্মেছি এই দেশে। সঙ্গীতটি পরিবেশনের আগে গানটি সম্পর্কে তাঁর একটি ছোট্ট কাহিনী তিনি শোনান। আলিপুর বোমার মামলায় যখন বিচারের রায়ে ফাঁসি ঘোষণা করা হয়, তখন সেই রায় শুনবার পর বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত বিচারকের কাছে এই গানটি গাইবার অনুমতি চেয়ে নিয়েছিলেন। (পরবর্তীকালে যদিও এই রায় পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি দেওয়া হয়েছিল ঐ মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বিপ্লবীদের।) ডাঃ নাথের উদাত্ত কণ্ঠে এই গানটির পরিবেশন উপস্থিত সকলকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দেয় এবং সকল শ্রোতারা উঠে দাঁড়িয়ে বীর বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানান।
ডাঃ নাথের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর কৃতি পুত্র শৌভিক নাথ। তিনি ২০০৫ সালে সেন্ট থমাস ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বর্তমানে CAP GEMINI-তে কর্মরত। শৈশব থেকে তিনিও ছবি আঁকার ক্ষেত্রে বিশেষ নৈপুণ্য অর্জন করেন। ১৯৯৫ সালে রাজ্যপালের হাত থেকে পুরস্কারও গ্রহণ করেন। বর্তমানে অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চা এবং অ্যাস্ট্রোফটোগ্রাফিতে তিনি একজন উল্লেখযোগ্য, বহুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব। এছাড়াও তিনি কলকাতায় স্কাই ভিউয়ারস ক্লাবের সম্পাদক। সঙ্গী হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী এবং বর্ষীয়ান কবি শ্রী অলোক দত্ত। শৌভিকের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠানে উপস্থিত সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা এবং অন্যান্য দর্শক শ্রোতারা অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে আকাশ পরিদর্শন করে।
শিশু নিকেতন বিদ্যালয়ের সমস্ত শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মী এবং শিশু নিকেতন সোসাইটির শাখা বর্ধমান ইনস্টিটিউট অফ ফার্মেসির সক্রিয় সহযোগিতায়। অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সার্থক এবং সাফল্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। ছাত্রছাত্রীরা যে এই আলোচনা সভা এবং আকাশ পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের আগামী দিনের জন্য কিছু মূল্যবান জ্ঞানের রসদ সঞ্চয় করতে পেরেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিদ্যালয়ের সভাপতি ধীরেন্দ্রনাথ সুর উপস্থিত প্রতিটি ছাত্রছাত্রীদের কাছে প্রত্যাশা রাখনে যে তারা ডাঃ শঙ্কর কুমার নাথের বক্তব্য থেকে পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞান শহিদ জিওর্দানো ব্রুনোর মৃত্যুকালীন বক্তব্যটি নিজেদের জীবনে অনুসরণ করার চেষ্টা করবে, ‘‘সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা যায় কিন্তু কোনো কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায় না।’’ ছবি : দ্বিতীয় ও তৃতীয় কভারে দেওয়া হল।