ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
স্নেহের ছোট্ট বন্ধুরা,
প্রতিবারের মত এবারও নিশ্চয়ই তোমরা ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করেছ। ১৯৫২ সালে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ) বাংলাকে, রাষ্ট্রভাষার দাবীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শহীদ এবং ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষে স্বাধীন ভারতে আসামে বাংলা ভাষার দাবীতে ১৯শে মে ১৯৬১ যে ১১ জন পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়েছিলেন সেই সব ভাষা শহীদদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়েছো এবং নিজের মাতৃভাষা বাংলার নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক করেছ। বাংলা ভাষার সপক্ষে অনেক বক্তব্য রাখা হয়েছে। কিন্তু তোমরা একবার ভেবে দেখেছো কি আমরা ধীরে ধীরে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে প্রতিনিয়ত হেয় এবং অবহেলা করে চলেছি। দু’শ বছরের ব্রিটিশ শাসনে থাকার ফলে আমাদের ইংরেজী ভাষার প্রতি যে মোহ সৃষ্টি হয়েছিল স্বাধীনতার পরেও আমাদের সেই ইংরেজী মোহ উত্তোরত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইংরেজী শেখার কোন বিরোধ নেই। কিন্তু বাঙালী মা যখন বলেন, ‘‘আমার ছেলের/মেয়ের বাংলাটা ভাল আসে না’’ তখন স্বাধীন ভারতবাসী হিসেবে বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার হিসেবে আমাদের লজ্জার শেষ থাকে না। জার্মান, ইটালি, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন, জাপান প্রভৃতি উন্নত দেশগুলি কিন্তু তাদের উচ্চ শিক্ষায় মাতৃভাষাই ব্যবহার করে। ইংরেজী জানে না বলে তারা কিন্তু আমাদের মত লজ্জিত হয় না। দুই দেশে মাতৃভাষা বাংলার জন্য যে তরুণরা প্রাণ দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা দেশের গণ্ডী ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আঙ্গিনায় পৌঁছে দিল আমরা কি তাদের কথা শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারি দিবস উদ্যাপনের মধ্যেই আমাদের দায়িত্ব শেষ করব, না আমরা আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট হব আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কথাবার্তা সংস্কৃতির অঙ্গণে। আজ বৈদ্যুতিন মাধ্যমে বিজ্ঞাপন, ধারাবাহিক প্রভৃতির মধ্য দিয়ে দুটি বাংলা শব্দের পরেই তিনটি ইংরেজী শব্দের মিশলে যে ইংরেজি চালাবার প্রয়াস এর বিরুদ্ধে সচেতনভাবে আমাদের সচেষ্ট হওয়া উচিত। এর সঙ্গে ইংরেজী শেখার কোন বিরোধ নেই। নিজের মাতৃভাষাটা ভাল করে উপলব্ধি এবং আয়ত্ত্ব হলেই যে কোন বিদেশী ভাষা শেখা সহজ হয়। এটা ভাষাবিদের কথা। রবীন্দ্রনাথের সেই কথা ‘মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধ’ আজও পৃথিবীর সর্বত্র প্রযোজ্য। কবি মধুসূদনের কথায় শেষ করি—
‘‘ওরে বাছা মাতৃকোষে রতনের
রাজি, এ ভিখারী দশা তবে কেন
তোর আজি? যা ফিরি, অজ্ঞান
তুই, যা রে ফিরি ঘরে।
পালিলাম আজ্ঞা সুখে; পাইলাম
কালে, মাতৃভাষা রূপ খনি, পূর্ণ মণিজালে।’’