ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
১৯৪৭ সালের অগাস্টের মাঝামাঝি ভারত বিভাগ পরিকল্পনা কার্যকরকরণ এবং পাকিস্তান সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগেই রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যেসব প্রবন্ধাদি প্রকাশিত হয়েছিল-- তাতে বাংলা জাতীয়তাবাদের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়েছিল--যেমন ভাষা ও সংস্কৃতিগত স্বাতন্ত্রচেতনা এবং সেই স্বাতন্ত্রের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার তীব্র ইচ্ছা। এই সময়ের আরও কয়েকবছর যদি আমরা পিছিয়ে যাই--তা’হলে আমরা দেখব যে হিন্দু বিত্তশালী ও মধ্যবিত্ত পৃষ্ঠপোষকতায় এবং পশ্চিমী সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সংস্পর্শে হিন্দু সমাজ মহান সৃষ্টিতে নিয়োজিত, আর তখন অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত এবং শিক্ষায় অনগ্রসর মুসলিম সমাজ মধ্যযুগীয় আবেগে আচ্ছন্ন। সমাজের সর্বস্তরে প্রচ্ছন্ন সাম্প্রদায়িকতার কারণে মুসলিম সাহিত্যপ্রয়াস বহুলাংশে হিন্দু লেখকদের দ্বারা উপেক্ষিত ছিল। তাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলে মুসলমান লেখকদের সাহিত্য সাধনার অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে এই ছিল তাদের মনের মণিকোঠায় সযত্ন লালিত স্বপ্নটি। কিন্তু ভারত বিভাগের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হওয়ার পর যখন শোনা গেল যে পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান অর্থাৎ বাঙালীদের মনের মণিকোঠায় লালিত স্বপ্নটি চুরমার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ভয় তাদের আচ্ছন্ন করল যে রাষ্ট্রভাষা উর্দু হ’লে--বাঙালী কি আর সরকারী চাকুরিতে অগ্রাধিকার পাবে?
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস ছিল এক অবিস্মরণীয়। গণ-জাগরণ, গণ-আন্দোলন এবং গণ-অভুত্থানের মাস। ১৯৫২ সাল থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি একুশে নামে এক বিশিষ্টতা লাভ করে। একদিকে জনসাধারণের ধর্মঘটের জন্য প্রস্তুতি অন্যদিকে পূর্ববঙ্গ সরকারের বাজেট অধিবেশন--এই দুইয়ের টানাপোড়েনে ভীত পাকিস্তান সরকার ২০শে ফেব্রুয়ারি রাত্রি থেকে ঢাকা জেলার সর্বত্র ধর্মঘট, সভা ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করল। একদিকে চূড়ান্ত সরকারী দমননীতি অন্যদিকে জনসাধারণের তীব্র অসন্তোষ। সারা শহরে এক থমথমে, গা ছমছমে ভাব। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের পক্ষ থেকে শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালাবার জন্য পরামর্শ দিলেন। ছাত্ররা তাঁর এই পরামর্শ মেনে নিতে রাজী হলেন না এবং প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে তাঁদের এতটাই বিব্রত করে তোলেন যে শামসুল হক এবং তাঁর অনুসারীরা সভাকক্ষ ত্যাগ করেন। ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে সংহত অভিমত ঘোষণা করে। এসময় ছাত্রনেতা আব্দুস সামাদ একটি আপোস প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। তিনি প্রস্তাব করলেন ছাত্ররা দশজন করে মিছিল করে বার হবে যা একধরণের সত্যাগ্রহের সমান। এই প্রস্তাবটির গুরুত্ব হল এই যে এতে ব্যাপকহারে গণ্ডগোল এড়ানো সম্ভব এবং ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করা হবে।
ঐদিন বেলা প্রায় ২টো পর্যন্ত মিছিল করে ছাত্ররা বীরত্বের সঙ্গে গ্রেফতারি বরণ করতে থাকে। তখন ধীরে ধীরে ছাত্ররা মেডিকেল হোস্টেল, মেডিকেল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের গেটে জমায়েত হতে থাকে। দলবদ্ধ হয়ে স্লোগান দিতে দিতে ছাত্ররা যতই একত্রিত হয়--পুলিশ ততই তাদের তাড়া করে যায়। কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার ক্ষেত্রে পুলিশ দ্বিতীয়বার চিন্তা করল না। কয়েকবার কাঁদানে গ্যাস ছেড়ে তাড়া করতে করতে মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের ভিতর ঢুকে পড়ে। হোস্টেল প্রাঙ্গণে ঢুকে ছাত্রদের উপর আক্রমণ করায়, ছাত্ররা ইঁট পাটকেল ছুঁড়তে শুরু করে। একদিকে ছাত্রদের ইঁট পাটকেল, অন্যদিকে কাঁদানে গ্যাস ও ক্রধোস্মত পুলিশের লাঠিচার্য--এই অসম লড়াইয়েও পরাজয়ের আশঙ্কায় পুলিশ গুলি চালাতে শুরু করে একেবারে ছাত্রদের দিকে তাক করে। গুলিতে প্রাণ দিয়ে শহীদ হন আব্দুল জব্বার ও রফিকুদ্দিন। আর গুরুতর ভাবে আহত হন সতের জন। ঐদিন রাত আটটা নাগাদ মারা যান এম.এ. (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র আব্দুল বরকত। বরকত দাঁড়িয়ে ছিলেন মেডিকেল কলেজের হোস্টেল শেডের বারান্দায়--তাঁর উরুতে গুলি লেগে প্রচুর রক্তপাতের ফলে এই মৃত্যু। গুলি চালনার খবর ছড়িয়ে পড়ল দেশের প্রতিটি কোণে। তখনই অফিস-আদালত, সেক্রেটারিয়েট ও বেতারকেন্দ্র ত্যাগ করে দলে দলে বেরিয়ে আসেন প্রতিটি কর্মী এবং শহরের অপামর জনতা--লক্ষ্য তাঁদের মেডিকেল কলেজ হোস্টেল--যেক্ষেত্র আজ পরিণত হয়েছে শহীদ রক্তস্নাত পূণ্যভূমি।
১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি আন্দোলনের সঙ্গে জনসাধারণের আশা-আকাঙ্খা এত গভীর ও সুদূরপ্রসারী ছিল যে সেই আন্দোলনের পূর্ণতা পেয়েছিল ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ উত্থানের মধ্য দিয়ে। মাতৃভাষার জন্য এই আন্দোলনকে স্মরণ করেই ১৯৯৯ সালে রাষ্ট্রসংঘ ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করবেন। তাই শহীদের রক্তে রাঙা ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ বিশ্বজুড়ে সকল জাতির মাতৃভাষা রক্ষার শপথের দিনও বটে।