ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
বাংলার অন্যতম কথা সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‘পথের পাঁচালী’’। উপন্যাসের নামটির সঙ্গে পরিচয় নেই, এমন বাঙালি বোধহয় খুব কমজনই আছেন! শুধু তো বড়রাই নয়, কিছুদিন আগে পর্যন্তও এই ‘‘পথের পাঁচালী’’ ছিল ঘরে ঘরে প্রতিটি পড়ুয়া শিশু, কিশোর-কিশোরীর সাহিত্যচর্চার প্রথম ধাপের একটি অত্যাবশ্যকীয় অঙ্গ। ঠাকুরমার ঝুলি, ঠাকুরদার ঝুলি, সুকুমার সমগ্র, উপেন্দ্রকিশোর সমগ্র, অবনঠাকুরের ক্ষীরের পুতুল, বুড়ো আংলা, খগেন্দ্রনাথ মিত্রের ভোম্বল সর্দার এই রকম বেশ কিছু বই যেমন প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে থাকত ঠিক তেমনি থাকত ‘‘পথের পাঁচালী’’। ছোটদের জন্মদিনে উপহার হিসেবেও এই সব বই খুব পছন্দের তালিকায় থাকত। ‘‘থাকত’’ কথাটা বলার কারণ হল এটাই, বিষয়টি মানতে কষ্ট হলেও ঘটনা হল, আজকের যারা শিশু বা কিশোর তারা জন্মের কিছুদিন পর থেকেই, বলতে গেলে নিজস্ব ভাবনা চিন্তা বোধ জাগ্রত হবার অনেক আগে থেকেই বইয়ের পরিবর্তে হাতে পেয়ে যায় মুঠোফোনের এক বিস্ত+ত আকাশ। যেখানে তাদের চোখ চলমান ছবির দুনিয়ায় প্রতি মুহূর্তে ছুটে বেড়াতে চায়! সেই চঞ্চল চোখ, চঞ্চল মনকে শান্ত করে বইয়ের পাতায় সাদা কালো হরফে ফুটে ওঠা হরেক ছবিতে নিবিষ্ট করার অভ্যেস আজ চোখে পড়ার মতো কম! তবু সেই হারাতে বসা অভ্যেসকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় নিরলস ভাবে নিঃশব্দে সাধনা করে চলেছেন মুষ্টিমেয় কিছু সাহিত্যপ্রেমী মানুষ, কবি বিজন দাস তাঁদেরই অন্যতম একজন। তাঁর সেই প্রচেষ্টার একটি অন্যতম ফসল হল ‘‘ছড়ায় পথের পাঁচালী’’।
এই বইটি সম্পর্কে কিছু বলবার আগে, আজকের শিশু, কিশোর পাঠক-পাঠিকাদের জন্য ‘‘পথের পাঁচালী’’ উপন্যাস সম্পর্কে কয়েকটি কথা মনে হয় বলে নেওয়া দরকার। প্রকৃতিপ্রেমী সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এটি ছিল প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস, প্রকাশিত হয় ১৯২৯ সালে। নিশ্চিন্দিপুর নামে এক গ্রামের প্রেক্ষাপটে এক দরিদ্র পূজারি ব্রাহ্মণ হরিহর রায়, তাঁর স্ত্রী সর্বজয়া, তাঁদের দুই পুত্র কন্যা অপু ও দুর্গা এবং তাঁদের পরিবারে অনাদরে আশ্রিত আত্মীয়া ইন্দির ঠাকুরুণ, মূলতঃ এই চরিত্রগুলিকে ঘিরে গ্রাম বাংলার নিসর্গ, প্রকৃতি, সেই সময়ের সমাজের বিশেষতঃ গ্রামীণ সমাজের দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতি নিয়েই এই উপন্যাস লেখা হয়েছিল।
এই উপন্যাসের তিনটি পর্ব ছিল। প্রথমটি হল বল্লালী বালাই, এর পর আম আঁটির ভেপু এবং সব শেষের পর্ব অত্রূ«র সংবাদ। বল্লালী বালাই কথাটি কেন এসেছিল একটু জেনে রাখো। রাজা বল্লাল সেন যে কৌলিন্য প্রথা চালু করেছিলেন তার ফলশ্রুতি হিসেবে তখন সমাজে প্রচলিত ছিল বহু বিবাহ প্রথা। বংশের কৌলিন্য রক্ষা করার জন্য একটি পুরুষের সঙ্গেই একাধিক কন্যার বিবাহ দেওয়া হত, যাদের বয়সের দিক দিয়ে এখনকার হিসেবে আমরা শিশুই বলতে পারি! প্রায় সময়েই দেখা যেত বয়সের অনেক তফাৎ থাকার জন্য খুব কম বয়সেই স্বামীর মৃত্যুতে অনেক মেয়েকেই বিধবা হয়ে বাবা মায়ের কাছে ফিরে আসতে হত এবং তারা অতি অল্প বয়স থেকেই পরিবারের কাছে বোঝা বা বালাই হয়ে অতি কষ্টে বাকি জীবনটুকু কাটাতে বাধ্য হত। ‘‘পথের পাঁচালী’’ উপন্যাসের প্রথম পর্বে আমরা ইন্দির ঠাকুরুণ নামে এইরকমই এক বল্লালী বালাইয়ের করুণ জীবনকাহিনী দেখতে পাই।
দ্বিতীয় পর্ব আম আঁটির ভেপুতে আমরা শিশু অপু এবং দুর্গার চোখ দিয়ে শুধুমাত্র গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা প্রকৃতির অগাধ রূপকেই যে নতুন করে খুঁজে পাই তা নয়, সেই সঙ্গে ভালোয়, মন্দয়, স্নেহে কিংবা বিদ্বেষে মানুষে মানুষে সম্পর্ক যে কতরকমের হতে পারে তারও একটি সুন্দর মর্মস্পর্শী ছবি দেখতে পাই। এই পর্বেই আছে শিশু অপুর শৈশবের কল্পনার জগৎটিকে নিয়ে কৈশোরের দিকে এগিয়ে যাওয়া, অসীম দারিদ্র্যের কষ্টকে অগ্রাহ্য করে হাসিমুখে ছুটে বেড়ানো চঞ্চল কিশোরী দুর্গার অকাল মৃত্যু এবং শেষ পর্যন্ত সংসার উদাসীন হরিহরের স্ত্রী পুত্রকে নিয়ে রোজগারের সন্ধানে নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে কাশীর উদ্দেশ্যে যাত্রা করা।
তৃতীয় পর্বে আছে অপুর মা বাবার সঙ্গে কাশীবাস, হরিহরের মৃত্যু এবং তার পরবর্তী নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যে দিয়ে নিশ্চিন্দিপুরে ফিরে আসার কাহিনী।
এই তিনটি পর্বের মধ্যে প্রথম দুটি পর্বকে কবি বেছে নিয়েছেন ছড়ার মধ্যে দিয়ে তুলে ধরার জন্য। উপন্যাসের তিনটি পর্বে মোট পঁয়ত্রিশটি পরিচছদ আছে, তার মধ্যে প্রথম দুটি পর্বেই আছে এক থেকে ঊনত্রিশ পরিচছদ পর্যন্ত। এই ঊনত্রিশটি পরিচ্ছদের কাহিনীর রূপ, রস, ভাব অক্ষুণ্ণ রেখে, ঘটনার ধারাবাহিকতাকে ছড়ার ছন্দে বর্ণনা করা যে কতখানি কঠিন কাজ, তা একমাত্র তাঁরাই বুঝতে পারবেন যাঁরা নিয়মিত ছড়া লেখার চর্চা করে থাকেন। বইটিতে কাহিনীর অংশগুলিকে ছোট্ট ছোট্ট ভাগে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ভাগের শিরোনামগুলি যেমন ছন্দময়, তেমনি অর্থবহ। শিরোনামটি দেখেই এক নজরে বুঝে নেওয়া যাচ্ছে কী বিষয় নিয়ে বলা হয়েছে?
যেমন শুরুতেই আছে, ‘‘মেঠোপথের দূর, নিশ্চিন্দিপুর’’। শুনেই বোঝা যাচ্ছে, নিশ্চিন্দিপুর গ্রামটির একটি ছবি তুলে ধরা হয়েছে এই অধ্যায়ে।
মেঠোপথের দূর
নিশ্চিন্দিপুর
আঁকন বাঁকন মেঠো রাস্তা
ধুলোয় ধুলোয় হাঁটে,
মাঠ পেরিয়ে গ্রামের ভিতর
গ্রাম পেরিয়ে মাঠে।
দু-পাশে তার বন,
সবুজ ছায়ায়, সবুজ মায়ায়
বড়োই আপন জন।
বন বনানী, সবুজ বাণী
হাওয়া রোদের গান,
গাছ-গাছালি আর মানুষের
ভিতর প্রাণের টান।
পাখির মিঠে সুর,
পথ-পাঁচালির ধারে সবুজ
নিশ্চিন্দিপুর।
শুরুতেই মনটা দুলে ওঠে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে গাছ গাছালীতে ছাওয়া, পাখপাখালীর মধুর কলকাকলীতে ভরা এক মায়াময় গ্রামবাংলার ছবি! শুধু তাই নয় সামান্য কয়েকটি ছোট্ট স্তবকের মধ্যে শুরুতেই তুলে ধরেছেন উপন্যাসের মূল চরিত্রগুলির সংক্ষিপ্ত পরিচয়।
এরপর একে একে আসে, ‘‘ভালোবাসার দিবানিশি/ দুর্গা আর ইন্দিপিসি’’, ‘‘ছন্দহারা বুড়ির/সুখ গিয়েছে চুরি’’, ‘‘পিসি বাড়ি নাই/হল দুর্গার ভাই’’, ‘‘পিসি ফিরল ঘরে/আনন্দে মন ভরে’’, ‘‘বুড়ি ফুরোলো/ জ্বালা জুড়োলো’’, ‘‘সুন্দর ফুটফুটে/অপু উঠেছে ফুটে’’, ‘‘কাজের ফাঁকে ফাঁকে/অপুকে দূর ডাকে’’, ‘‘বীর কর্ণের গাথা/অপুর মনে ব্যথা’’, ‘‘অপুর মনের মত/যুদ্ধ কোথায় এত’’, ‘‘ময়রা চিনিবাস/দিদির আশ্বাস’’, ‘‘দিদি নাকি চোর/মার খেল খুব জোর’’, ‘‘কালবোশেখির সাড়া, আম কুড়োবার তাড়া’’... এইভাবে একটির পর একটি অধ্যায়ে ছন্দে ছন্দে বয়ে গেছে কাহিনীর প্রবাহ, ফুটে উঠেছে সম্পর্কের বুনন, মায়া মমতা ভালোবাসা, কখনো ফুটে উঠেছে গ্রাম বাংলার দরিদ্র পরিবারগুলির নিদারুণ দুর্দশার ছবি, ফুটে উঠেছে বালক অপুর কল্পনা প্রবণ মনের তৈরি করা অসংখ্য ছোট ছোট ভালো লাগা মুহূর্ত। সব শেষে নিশ্চিন্দিপুর গ্রামকে ছেড়ে যাওয়ার সময় নতুন অচেনা জগতের হাতছানির উত্তেজনার সাথে সাথে শৈশবের চির চেনা জায়গাটিকে, পরিচিত সব প্রতিবেশী, মানুষজন প্রিয় সব গাছপালা, পথঘাট, দিদি দুর্গার স্মৃতি সবকিছুকে পিছনে ফেলে যাওয়ার বিষাদ, এই দুইয়ের টানাপোড়েন নিয়ে অপুর এগিয়ে যাওয়া। অপুর মনের সেই বিষাদের বর্ণনা আমাদেরও মনকে ভারী করে তোলে--
আজকে থেকে সত্যি সত্যি
নয়কো খেলার আড়ি,
দিদির সঙ্গে চিরকালের
জন্য ছাড়াছাড়ি।
কত বিকেল কত দুপুর
আমোদ অবসাদ,
দিদির করুণ মুখটা, দিদির--
না মেটা সব সাধ।
দিদির করুণ সেই অনুরোধ
বুকটা করে ভারী,
সেরে উঠলে আমায় একদিন
দেখাবি রেলগাড়ি।
ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে অপু
যেন বলতে চায়,
দিদি তোকে ভুলিনি রে
আমি অসহায়।
ছেড়ে যেতে চাইনি তোকে
আমার উপায় নাই,
ওরা আমায় নিয়ে যাচেছ
যাচ্ছি আমি তাই।
কু ঝিক ঝিক ছুটছে গাড়ি
অজানা দূর পানে,
দূর ভেসে যায় দূরে দূরে
পথের গানে গানে।
ব্যথাতুর অপুর উদ্দেশ্যে কবির কবিতায় পথের দেবতা বলে ওঠেন--‘‘জানি অপু তোমার মনে/উঠেছে আজ ঝড়,/নিশ্চিন্দিপুরের জন্য/কাঁদছে তো অন্তর।/ বুকের ভিতর থাকুক দিদি,/নিশ্চিন্দিপুর,/সামনে তোমার অনন্ত পথ/রোমাঞ্চে চুর চুর।/পথ করেছে সঙ্গী তোমায়/এগিয়ে যাওয়া চাই,/নতুন আলো অন্ধকারে/চলো এগিয়ে যাই-/চলো এগিয়ে যাই...’’
পরিশেষে একটা কথাই বলতে চাই আজকের দিনে শিশু এবং কিশোরদের প্রতিদিনের ইঁদুর দৌড়ের ব্যস্ততার মধ্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘‘পথের পাঁচালী’’ উপন্যাসটি যদি পড়ে ওঠা সম্ভব না’ও হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যারা নতুন পড়ুয়া তাদের জন্য যে এই ‘‘ছড়ায় পথের পাঁচালী’’ মূল উপন্যাসের প্রতিটি ঘটনাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে, একটি সহজ সরল, সংক্ষিপ্ত অথচ যথাযথ ছবি তুলে ধরবে, এটা নির্দ্বিধায় বলা যেতে পারে। কবি বিজন দাস তাঁর এই সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে ভাবী প্রজন্মের হাতে একটি মূল্যবান উপহার তুলে দিয়ে গেলেন। প্রচ্ছদ, অলঙ্করণ, মুদ্রণ সব মিলিয়ে ‘‘ছড়ায় পথের পাঁচালী’’ একটি অত্যন্ত মনোগ্রাহী ছড়ার বই। এটি পাঠক প্রিয় হয়ে উঠবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
হ য ব র ল পক্ষে হাল্যান, বাগনান, হাওড়া-৭১১৩১২ থেকে রোহণ কুদ্দুস কর্তৃক প্রকাশিত। গ্রন্থস্বত্ব-বিজন দাস, চিত্রস্বত্ব-রোহণ কুদ্দুস। মূল্য-২৯৯ টাকা। প্রথম মুদ্রণ-এপ্রিল ২০২৫। প্রাপ্তিস্থান-৭২/২এ, পটুয়াটোলা লেন, কলকাতা-৭০০০০৯। যোগাযোগ-৭৮২৯৭৪১৭৯৭ / ৯৯১০২৭০৪৩২