ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
মন্টুর দাদু শিবরাম বাবু নাতিকে ডাক দিয়ে বললেন, ‘ওরে, আজ রাতে বার্সিলোনা আর স্যান্টোজের খেলা আছে না?’
‘হ্যাঁ দাদু, তুমি বসে যাও। আমি আসছি। ব্যাস, আমি একটু আইসক্রিমটা নিয়ে বসি। আর দশ মিনিট আছে।’
‘একটা বাটিতে আমাকেও--’
‘আরে বাবা, সেটা আবার মনে করাতে হবে নাকি? টেক ইয়োর সিট ফার্স্ট।’
মন্টুর মা পুতুল সবাইকে চা এবং টা দিয়ে আগেই টিভি খুলে বসে গেছিলেন। সেখান থেকেই বললেন, ‘মন্টু, আইসক্রিম বেশি করে নিও না কিন্তু। দাদুর বয়স হয়েছে। বুকে সর্দি বসে যাবে।’
শিবরাম বললেন, ‘বৌমা, তোমার বাবা কি পুলিশের বড় কর্তা? এত কড়া নজর কেন মা?’
মন্টু যেই ফ্রিজের দিকে পা বাড়াল, অমনি বাড়ির আর দুজন তার পিছু পিছু গিয়ে হাজির। দুজনের চার চোখে অনেক আশা। ফ্রিজের দরজা খুলে দুটো বাটিতে আইসক্রিম নিতে নিতে মন্টু তাদের শাসন করে, ‘তোরা বড্ড হ্যাংলা হয়ে উঠেছিস। যেই শুনলি আইসক্রিম নিতে এসেছি, অমনি—।
সিম্বার হলুদ চোখ দুটো জ্বল জ্বল করে উঠল, ‘ম্যাঁও, বাহ! আমাদের বেলাতেই দোষ। আর নিজে যে একবাটি নিয়ে বসছ? নিজের বেলায় আঁটিসাঁটি/ পরের বেলা কাটা কাটি।’
তার পাশেই বসে ছিল মন্টুর বাবা রণজিতের পোষা গোল্ডেন রিট্রিভার সোনা। সে বেচারা জুল জুল করে চেয়ে নিজের ল্যাজটা নাড়তে থাকে, ‘ওস্তাদ, সুজন স্বজন হলে করে ভাগাভাগি/মুঠো হাত খোলা থাকে বন্ধুদের লাগি।’
সে যাই হোক। মন্টুও তাদের ভালোই বাসে। বন্ধুত্বের মর্যাদা দিতে সে পিছপা হলো না। এক এক স্পুন ভরে সে মেঝের ওপর দুজনের সামনেই দিয়ে দিল। বলা বাহুল্য, মুহূর্তে তা হয়ে গেল সাফ।
ওদিকে ততক্ষণে টিভি স্ক্রীনে হৈ হৈ শুরু হয়ে গেছে। শিবরাম হাঁক পাড়লেন, ‘মন্টু টস হচেছ’
ফ্রিজ বন্ধ করে মন্টু ছুট দিল দাদুর কাছে। এরা দুজন— মানুষের মত না হলেও— হাঁ করে চেয়ে রইল, ফ্রিজের বন্ধ দ্বারের পানে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোনা বললে, ‘আরেকটু দিল না রে। দোস্ত দোস্ত না রহা/জগ মেঁ প্যার হ্যায় কহাঁ?’
‘চুপ কর তো। বেশি প্যান প্যান করিস না। একটু ভাবতে দে। সব রাস্তা কখনও বন্ধ হয় না। সমস্যা যখন আছে, তখন তার সমাধানও আছে।’
সোনা একদৃষ্টে ফ্রিজের দিকে চেয়ে রয়েছে। বোধহয় একবার ফোঁৎ করে তার দীর্ঘশ্বাস পড়ল। জিভের ডগা থেকে টস টস করে নোলা ঝরে পড়ছে। ফ্রিজের সামনে মেঝেটা ভিজে উঠেছে।
ওদিকে খেলা দারুণ জমে উঠেছে। শিবরাম বাবু স্যান্টোজ সাপোর্টার। কারণ স্বয়ং পেলে এই ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। আবার নাতি বাবু বার্সিলোনার ফ্যান। সে বলে, ‘ম্যারাদোনা ন্যাপোলি ছেড়ে তো বার্সিলোনাতেই এসেছিল।’
সিম্বা একবার বন্ধুর দিকে চেয়ে হয়ত মনে মনে বলে উঠল, ‘আহা রে, তুই বড় ভালো মানুষ রে সোনা।’ তারপরেই সে ডাক দিল, ‘সোনা কুইক। এখন এ্যাকশান।’
সোনা আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইল।
‘আইডিয়া!’ সিম্বা ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির’-এর স্টাইলে চার পায়ে দাঁড়িয়ে গেল। তার ল্যাজ ত্রিশূলের মত সোজা হয়ে উঠল। সে মুখ ফিরিয়ে বন্ধুকে বলল, ‘গীতায় স্বয়ং কৃষ্ণ বলেছেন— সোজা আঙ্গুলে ঘি ওঠে না। অর্থাৎ, বিনা যুদ্ধে নিজের অধিকার পাওয়া যায় না।’
‘তার মানে? তুই কি করতে চাস, ভাই?’ সোনার গলা শুকিয়ে এসেছে।
‘অ্যাই, হাঁ করে চেয়ে থাকিস না তো। সোজা হয়ে দাঁড়া তো দেখি।’
‘জো হুকুম, জাহাঁপনা।’ বলতে বলতে সোনা ফ্রিজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। অমনি সিম্বা তড়াক করে লাফ দিয়ে তার পিঠে দাঁড়িয়ে গেল। যেন সিংহবাহিনী। তারপরেই হাতড়ে হাতড়ে ফ্রিজের হাতলটা ধরে কোনমতে টান দিতে লাগল। কষ্টে মেলেন কেষ্ট। অল্পক্ষণের চেষ্টাতেই চিচিং ফাঁক। ফ্রিজের দরজা গেল খুলে। আর তারপর?
সেও বলতে হবে?
দুই হাতে আইসক্রিমের ডিবেটা ধরে নামাতে গিয়ে তিনি পড়লেন মাটিতে। মেঝেময় আইসক্রিম। আর কি সবুরে মেওয়া ফলে? দুই বন্ধুতে চার হাত জিভ বের করে তাই সাবার করতে লাগল। মুহূর্তে মেঝে ঝকঝক করতে লাগল।
তারপরেই দুজনে হাওয়া।
ম্যাচ শেষ হতে পুতুল চলে এসেছে সবার খাবার বাড়তে। রাতের ডিনারের জন্য খাবার গরম করবে বলে ফ্রিজের ডোর খুলতে যেতেই তার চক্ষুস্থির, ‘এ কি মন্টু! তুই কি ঠিক করে ফ্রিজটা বন্ধ করিসনি? এ কী তাড়াহুড়ো রে বাবা? আইসক্রিমের বাটিটা মেঝেতে পড়ল কী করে?’
‘আমি কী জানি, মা? আমি তো ব্যাস আমার আর দাদুর--’, বলতে বলতে মন্টু এসে দাঁড়ালো, ‘মা, এই দেখ। ডিবের সমস্ত আইসক্রিম তো ভ্যানিস।’
‘তার মানে?’
তা, এর মানে বোঝার জন্য কি আর অভিধান লাগে?
মন্টু চিৎকার করে উঠল, ‘সোনা! অ্যাই সিম্বা! তোদের সাহস তো কম নয়! তোরা শেষ পর্যন্ত ফ্রিজের দরজা খুলে চুরি করেছিস? দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজা।’
পুতুল তো থ মেরে নাটকের ফ্রিজ শট দিচ্ছে। ততক্ষণে রণজিৎও হাজির। সব শুনে সুপ্রীম কোর্টের রায় দিলেন, ‘এত দূর স্পর্ধা? আজ রাতে এ দুটোর খাবার বন্ধ করে দাও।’
পুতুল একটু ধীরে বলে উঠল, ‘আহারে!’
ওদিকে শিবরাম বাবুও এসে দাঁড়িয়েছেন। সব শুনে তিনি অট্টহাস্য করে উঠলেন (এক যুগে তিনি নাটক টাটক করতেন), ‘কিন্তু দুজনের কেরামতিটা কিন্তু দেখার মত। এত বড় ডাকাতি! কাল সকালের খবর কাগজে ব্যাপারটা জানাতে হবে। হাঃ হাঃ!’
দুই বন্ধুতে ভয়ে ভয়ে এসে পুতুলের পেছনে দাঁড়াল।
রণজিৎ পা ঠুকে হাঁক পাড়লেন, ‘এই বদমাইশরা, দুটোতে লুকোচ্ছিস কোথায়? সামনে আয়।’
শিবরাম বাবু বুড়ো ছেলের মাথায় হাত রাখেন, ‘আহা রণ, কী হচ্ছে? ওরা না হয় নিজেদের জিভটাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে ফেলেছে। তুই নিজের হৃদয়টাকে এবার সম্পূর্ণ উদার করে ফেল।’
‘আহা, থাক না। একটু আইসক্রিম চুরি করেছে বলে তুমি ওদের মারবে নাকি? এই আমিই ওদের শাস্তি দিয়ে দিচ্ছি।’ বলেই পুতুল দুই বন্ধুর কানগুলো মুচড়ে দিলেন, ‘দুষ্টু কোথাকার, এমনি করতে আছে? বাবা রেগে গেলে কি আর তোদের আস্ত রাখবে?’
দুই বন্ধুতে মাথা নিচু করে রইল। এখন যে রাতের ডিনারের সময়। আর তারা জানে যে মা আজকে পায়েস করছে। কে জানে— মাথা নিচু করে দুটোতে কি হাসছিল?
বলতে পারিনা।