ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
আনুমাণিক ১৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আর্যজাতির আগমনের পর থেকে ভারতবর্ষে আর্য ভাষার প্রচলন হয়। ভাষাতাত্ত্বিকেরা মনে করেন ভারতীয় আর্য ভাষা হল ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষাগোষ্ঠীর সদস্য। প্রায় ৫০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই ভাষাগোষ্ঠী ইউরোপ থেকে দক্ষিণ এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রচলিত ছিল। একসময় প্রাচীন ভারতীয় ভাষা হিসেবে ‘সংস্কৃত’ লেখ্য ভাষার মর্যাদা পেয়েছিল। ভাষাবিজ্ঞানের বিচারে বলা চলে যে সংস্কৃত তথা প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা কালক্রমে পালি, প্রাকৃত, অবহট্ট প্রভৃতি বিভিন্ন রূপে বিবর্তিত হতে হতে জন্ম নিলো এই বাংলা ভাষা। কিন্তু প্রাকৃত ভাষা আবার নানা রূপে বিভক্ত। সৌরসেনী প্রাকৃত, মহারাষ্ট্রী প্রাকৃত, মাগধী প্রাকৃত আর অর্ধ-মাগধী প্রাকৃত--এই চার ধরনের প্রাকৃত ভাষার উল্লেখ পাওয়া যায়।
ভাষাবিদরা দাবি করেন অসমীয়া, ওড়িয়া বা ভোজপুরি ভাষার মতো বাংলা ভাষারও উদ্ভব হয়েছে মাগধী প্রাকৃত থেকে। ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে খ্রিস্টিয় দশম শতাব্দীতে মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলাভাষার উৎপত্তি হয়েছিল। কিন্তু মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন, সপ্তম শতকে ‘গৌড়ীয় প্রাকৃত’ থেকে বাংলা ভাষার উদ্ভব এবং সেটাই ছিল গৌড় অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর কথ্য ভাষা।
এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ভাষার উৎপত্তি এবং বিবর্তনের ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিসরের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। একসময় ‘গৌড়ভূমি’ বা ‘বঙ্গ’ বলতে বোঝাত উত্তর দিকে হিমালয় থেকে নেপাল, পূর্বে ত্রিপুরা-চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল আর পশ্চিমে দ্বারভাঙা, রাজমহল, ছোটনাগপুর থেকে একেবারে বঙ্গোপসাগার পর্যন্ত বিস্তূত সমগ্র গাঙ্গেয় এলাকা। ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়ও মনে করেন, যে বিশেষ ভূখণ্ডে বাঙালিদের বসবাস ছিল সেখানে বাংলা ভাষার আধিপত্য থাকবেই। কালে কালে লোকজীবনের নানা ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির প্রভাব পড়েছে বাংলা ভাষার ওপরে, তারপর ভৌগোলিক অঞ্চল ভেদে নানা উপভাষায় বিভক্ত হয়েছে। রাঢ় অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর কথ্য ভাষা যেমন ‘রাঢ়ি’, তেমনই বরেন্দ্রভূমির ভাষা ‘বারেন্দ্রি’, অসমের ‘কামরূপী’, ঝাড়খণ্ডের ‘ঝাড়খণ্ডী’ আর বাংলাদেশের ‘বঙ্গালি’।
উৎপত্তির পর থেকেই নানা বিবর্তনের ছাপ পড়েছে বাংলা ভাষার ওপরে। ভাষা-গবেষকেরা তাই যুগবিন্যাস করেছেন। দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কাল প্রাচীন বা আদি যুগ, এরপর অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত মধ্য যুগ আর তারপর থেকেই শুরু হয়েছে আধুনিক যুগ। তবে মধ্যযুগকেও আবার দু’ভাগে ভাগ করা হয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত আদি-মধ্য যুগ আর তারপরে অন্ত-মধ্য যুগ বা চৈতন্যোত্তর যুগ।
বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ কর্তৃক রচিত সাধন-ভজনমূলক ধর্মীয় সাহিত্য ‘চর্যাপদ’ আদি যুগে বাংলা ভাষায় প্রাচীনতম সারস্বত নিদর্শন। ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত আদি-মধ্যযুগে রচিত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী কিংবা রামায়ণ-মহাভারতের মতো অনুবাদ সাহিত্য। অন্ত-মধ্যযুগে আমরা পাই চৈতন্য জীবনীকাব্য। এই মধ্যযুগেই বাংলা সাহিত্যের মর্যাদা তার নিজস্ব সৃষ্টির গৌরবে এক বিশেষ উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল। অনুবাদ সাহিত্য ছাড়াও বিভিন্ন ধারার মঙ্গলকাব্য, শাক্ত পদাবলী, লোকসাহিত্য, নাথ সাহিত্য, ময়মনসিংহ গীতিকা বা শিবায়ন কাব্য আর তার সঙ্গে চৈতন্যদেবের জীবন ও দর্শন ভিত্তিক সাহিত্যকে বাংলা ভাষার অলংকার বলা চলে। উনবিংশ শতকের শুরুতেই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের প্রতিষ্ঠা আর বাংলা গদ্য সাহিত্যের সূচনাপর্ব থেকে শুরু হয়েছে আধুনিক যুগ। তারপর থেকে প্রতি মুহূর্তেই সমৃদ্ধতর হয়ে উঠেছে বাংলা ভাষা, আমাদের মাতৃভাষা। একজন বাঙালির কাছে এটা কি কম গৌরবের?