ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
প্রায় চারশো বছর আগের কথা। ইটালীর পিসা শহর। সেখানে আছে এক হেলান মিনার। এই মিনারের সামনে খুব ভিড় জমেছে। ভিড়ের মধ্যে পণ্ডিতও আছেন কয়েকজন। এঁদের সামনে কী এক পরীক্ষা করে বহুদিনের ভুল ভাঙ্গবেন এক তরুণ বিজ্ঞানী। বিজ্ঞানী মিনারের ওপর উঠলেন। তাঁর হাতে দুটি সীসের বল--একটি দশ পাউন্ডের, একটি এক পাউন্ডের। মিনারের চূড়া থেকে তিনি একযোগে বল দুটি নীচে ছুঁড়ে দিলেন। বল দুটি একই সঙ্গে বেশ শব্দ করে মাটির ওপর পড়ল। এই শব্দে বেজে উঠল পুরোন দর্শনের মৃত্যু ঘণ্টা। ঘোষিত হল নূতনের আগমন। বহুদিন ধরে লোকে অ্যারিষ্টটলের মত মুখস্থ করেছে। অ্যারিষ্টটলের মত--উঁচু জায়গা থেকে দুটি ভারী জিনিষ নীচে ছুঁড়ে দিলে, যেটার ওজন বেশী সেটি আগে মাটিতে পড়বে। অ্যারিষ্টটলের মত। তাই সকলের শিরোধার্য। মতের সত্যতা যাচাই করার কথা কারো মাথায় আসেনি। যে তরুণ বিজ্ঞানী হাতে-নাতে ভুলটি ধরিয়ে দিলেন তাঁকে বলা হয় সর্বপ্রথম আধুনিক বিজ্ঞানী। তিনি হলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি।
গ্যালিলিওর জন্ম ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই ফেব্রুয়ারি ইটালীর পিসা শহরে। গান-বাজনা ও কবিতায় তাঁর অনুরাগ ছিল। পড়াশুনাতেও ভাল ছিলেন। সতের বছর বয়সে চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে তিনি পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্ত্তি হন। ভর্ত্তি হলেন চিকিৎসাবিদ্যা পড়তে, তাঁর মন কিন্তু পড়ে থাকত গণিতের ক্লাসে। নিজের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে তিনি গণিতের ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে অধ্যাপকের বত্তৃ«তা শুনতেন। ক্লাস ভাঙ্গলে, কী পড়ান হল, ভাল করে জানার আগ্রহে ছেলেদের অতিষ্ঠ করে তুলতেন। গণিতে তাঁর এই অনুরাগের কথা শুনে, গণিতের অধ্যাপক তাঁকে গণিতের ক্লাসে ভর্ত্তি করাবার ব্যবস্থা করেন। ফলে, অল্প সময়ের মধ্যেই গণিত ও পদার্থবিদ্যা তাঁর আয়ত্তে এল। তাঁকে পিসা বিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক করা হল।
বইয়ে যা পড়তেন তা যে ঠিক তা হাতে-নাতে পরীক্ষা করে দেখার দিকে তাঁর খুব ঝোঁক ছিল। তাঁর বয়স যখন আঠারো তখন তিনি এমনই একটি পরীক্ষা করেছিলেন। পিসার গির্জায় একটা ঝুলান প্রদীপ দেখে তিনি কৌতূহলী হন। বাড়ীতে এসে শুরু হল তাঁর পরীক্ষা কয়েকটি সূতোয় ভিন্ন ওজনের কয়েকটি সীসের বল বেঁধে দোলাতে থাকলেন। দেখা গেল, বলের ওজন কিংবা দোলনের বিস্তার যাইহোক না কেন, ডান থেকে বাঁয়ে গিয়ে, বাঁ থেকে ডানে ফিরতে বলগুলির একই সময় লাগছে। সূতো ছোট, বড় হলে অবশ্য এর হের ফের ঘটে। আবিষ্কার হল দোলনের ধর্মের। ফলে দেওয়াল-ঘড়ি এবং কালমাপক অন্যান্য যন্ত্রপাতি প্রস্তুত করা সম্ভব হল।
অধ্যাপক হয়েই যে পরীক্ষাটি করেন, তার কাহিনী উপরে বলেছি। বস্তুর গতি সম্বন্ধে অ্যারিষ্টটলের শিক্ষা যে ভুল তা তিনি প্রমাণ করলেন। কিন্তু প্রমাণ করলে কি হবে? প্রাচীনপন্থীরা তাঁর কথা কিছুতেই মানবেন না। তাঁরা প্রবীণ, তাঁরা বিজ্ঞ। তাই তাঁদের চোখ-কান ঢাকা। চোখে দেখেও সত্যকে স্বীকার করবেন না। উল্টে তাঁরা তাকে জব্দ করার ফিকির খুঁজতে লাগলেন।
এই সময়, এক বন্ধুর চেষ্টায়, তিনি পাদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হন। এতে তাঁর ভালই হল। বেতন বাড়ল। বিজ্ঞান-চর্চার সুযোগ এবং স্বাধীনতাও পেলেন প্রচুর। শুরু হল জ্যোতির্বিজ্ঞানে গবেষণা। কিছু আগে দূরবীক্ষণ যন্ত্র বা দূরবীনের আবিষ্কার হয়েছে। এই আবিষ্কারের কথা শুনে, আলোকবিদ্যার সূত্র প্রয়োগ করে একটি নলের দুই মুখে একটি উত্তল এবং একটি অবতল লেন্স বসিয়ে তিনি দূরবীন তৈরী করলেন। নানা উন্নতির ফলে এতে দূরের জিনিষকে অন্তত ৩০ গুণ বড় করে দেখা যেত। গ্যালিলিও দূরবীনকে লাগালেন জ্যোতিষ্কলোকের রহস্যভেদ করতে।
প্রথমেই তাঁর নজর পড়ল চাঁদের ওপর। চাঁদ পৃথিবীর নিকটতম প্রতিবেশী। দূরবীন দিয়ে চাঁদকে তন্ন তন্ন করে দেখে তিনি একটি বই লিখলেন ১৬১০ সালে। আমাদের পৃথিবীর মতোই চাঁদের উপরিভাগ পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা, নদী, গহ´র জলাশয় প্রভৃতি দিয়ে গঠিত। এই হল তাঁর মত। প্রাচীন পণ্ডিতগণ মনে করতেন চাঁদের পিঠ সমতল। চাঁদের কাল দাগের কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তাঁরা দিতে পারেন নি। দূরবীনের সাহায্যে গ্যালিলিও প্রমাণ করলেন, পৃথিবীর মত চাঁদের পিঠও অসমতল। শুধু তাই নয়, তিনি বললেন, পৃথিবী থেকে চাঁদকে আমরা যেমন উজ্জ্বল দেখি, চাঁদ থেকে যদি পৃথিবী দেখা সম্ভব হয়, তবে পৃথিবীকেও অনুরূপ উজ্জ্বল দেখাবে। পৃথিবীর কোন দ্যুতি নেই বলে যাঁরা একে গ্রহ বলে মানতে চাইতেন না এই ভাবে তিনি তাঁদের মত খণ্ডন করেন।
এরপর তিনি বৃহস্পতিকে নিয়ে পড়লেন। দূরবীন দিয়ে তিনি বৃহস্পতির চারটি পর্যন্ত উপগ্রহ আবিষ্কার করলেন। এই আবিষ্কারও প্রাচীন পণ্ডিতদের আর একটি বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত করল। প্রাচীনরা বিশ্বাস করতেন, গ্রহ-নক্ষত্র সকলে একমাত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। কিন্তু গ্যালিলিওর আবিষ্কার দেখিয়ে দিল, অন্যান্য গ্রহকে কেন্দ্র করেও জ্যোতিষ্করা ঘুরতে পারে। কোপারনিকাস পৃথিবীর গতির কথা বলায় কোন কোন প্রাচীনপন্থী প্রশ্ন করেছিলেন, গতিশীল পৃথিবীর চারিদিকে চন্দ্র প্রদক্ষিণ করবে কেমন করে? তার তো পেছনে পড়ার কথা। গ্যালিলিওর আবিষ্কারে তাঁদের সেই আপত্তি টিকল না। গতিশীল বৃহস্পতিকে কেন্দ্র করে একটি দুটি নয়, চার চারটি উপগ্রহ ঘুরছে।
১৬১০ সালের শেষাশেষি গ্যালিলিও শনির চাকা আবিষ্কার করেন। অবশ্য শনির চাকার রহস্য তিনি পুরোপুরি ভেদ করতে পারেন নি। এরপর তাঁর সত্যসন্ধানী দৃষ্টি পড়ল শুক্রের ওপর। চাঁদের মত শুক্রেরও যে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে তা তিনি আবিষ্কার করেন। কোপারনিকাস বলেছিলেন, মানুষের দৃষ্টিশক্তি বাড়ানো গেলে চাঁদের ন্যায় বুধ ও শুক্রের কলা দেখা যাবে। গ্যালিলিও কোপারনিকাসের এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত করলেন। তারপর সৌরকলঙ্কের আবিষ্কার। এই আবিষ্কারের গৌরব অবশ্য গ্যালিলিওর একার নয়। এছাড়া তিনি নীহারিকার স্বরূপ ব্যাখ্যা করেছিলেন। একটি নতুন নক্ষত্রেরও সন্ধান পেয়েছিলেন গ্যালিলিও।
এই সব আবিষ্কার নিরীহ হলে কী হবে? এদের তাৎপর্য খুবই বৈপ্লবিক। এগুলি ধর্মশাস্ত্রের বিরোধী। এতে কোপারনিকাস প্রচারিত সূর্য কেন্দ্রীয়তার পোষকতা হয়। ধর্মশাস্ত্রে বলা হয়েছে পৃথিবী কেন্দ্রীয়তার কথা। টলেমির শিক্ষা শাস্ত্রানুযায়ী। এই শিক্ষাকে পদে পদে মিথ্যা প্রমাণিত করল গ্যালিলিওর আবিষ্কার। ফলে গ্যালিলিওর ওপর যে শুধু প্রাচীনপন্থী পণ্ডিতগণ রুষ্ট হলেন, তাই নয়। চার্চেরও বিষদৃষ্টি পড়ল তাঁর ওপর। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে চার্চ থেকে তাঁর ওপর আদেশ জারি করা হল, তিনি যেন কোপারনিকাসের মতবাদ প্রচার ও সমর্থন না করেন।
গ্যালিলিওর একটি মারাত্মক ভুলের সুযোগে চার্চ তাঁর ওপর খবরদারি করার সুযোগ পায়। ভুলটি হল--পাদুয়ার চাকরী ছেড়ে তাঁর পিসায় যাওয়া। পিসায় ছিল চার্চের সর্বময় কর্তা পোপের কর্তৃত্ব। পোপ গ্যালিলিওর ধর্মদ্রোহিতা সহ্য করবেন কেন? গ্যালিলিওর উপরে আদেশ জারি করা হল, তিনি যেন কোপারনিকাসের মতবাদ সমর্থন ও শিক্ষাদান থেকে বিরত থাকেন। পৃথিবীর গতিবাদ সম্পর্কে আলোচনা, পঠন-পাঠনও নিষিদ্ধ হয়। গ্যালিলিও যে পথে চলেছেন ওই পথ যে অন্ধবিশ্বাস ও সংস্কার ভাঙ্গনের পথ। আর এই অন্ধবিশ্বাস ও সংস্কারের পরেই তো সমস্ত ধর্ম দাঁড়িয়ে আছে।
চার্চের হুকুমে দমে গেলেও গ্যালিলিও ভেঙ্গে পড়লেন না। তাঁর বিজ্ঞান চর্চা চলতেই লাগল। ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হল তাঁর অমর গ্রন্থ--"Dialogue concerning the two chief systems of the world, the Ptolematic and the Copernican" (টলেমীয় এবং কোপারনিকীয়--বিশ্বের দুটি প্রধান পদ্ধতি সম্পর্কে কথোপকথন) নামেই প্রকাশ, বইটি কথোপকথনের ভঙ্গীতে লেখা। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই বইটি গ্যালিলিওর শত্রুদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তারা পোপকে বুঝাল, গ্যালিলিও তাঁর নিষেধ তো মানেননি বরং বইটিতে তাঁকে অপদস্থ করেছেন। ১৬৩৩ খ্রিস্টাব্দে চার্চের আদালতে তাঁর বিচার শুরু হয়। তাঁর ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন চালান হয়। ৬৯ বছরের বৃদ্ধের পক্ষে দৈহিক নিপীড়ন সহ্য করা সম্ভব হয় নি। অপরাধ স্বীকার করে তিনি পোপের মার্জনা ভিক্ষা করেন। ‘ভ্রান্ত ও ধর্মবিরুদ্ধ মত’ বর্জন করে তিনি প্রতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করেন।
রোমে কিছুকাল বন্দী জীবন-যাপন করে গ্যালিলিও নজরব¨ী হয়ে ফ্লোরেন্সের কাছে বাকী জীবন কাটান। ১৬৩৭ সালে তিনি অন্ধ হয়ে পড়েন। এই অন্ধ অবস্থাতেই তিনি প্রকাশ করেন-- "Mathematical discourses concering two new Sciences Relating to Mechanics and Local Motion" (বলবিদ্যা এবং স্থানীয় গতি সংক্রান্ত দুই নয়া বিজ্ঞানের বিষয়ে গাণিতিক আলোচনা)--বলবিদ্যার ওপর তাঁর সারাজীবনের গবেষণার ফল। আকাশের গবেষণায় বেঁচে থাকতেই যে খ্যাতি তিনি পেয়েছিলেন, বলবিদ্যার গবেষণায় তা পান নি। কিন্তু এই ক্ষেত্রেই অনন্য সাধারণ প্রতিভার নির্ভুল প্রকাশ ঘটে। গতি, ত্বরণ ও বল সম্বন্ধে তাঁর গবেষণার গুরুত্ব অসাধারণ। বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, ‘‘প্রকৃতিতে গতি অপেক্ষা পুরাতন বোধহয় আর কিছুই নাই। এই গতি সম্বন্ধে দার্শনিকগণ এ পর্যন্ত বড় কম গ্রন্থ রচনা করেন নাই। তথাপি পরীক্ষার দ্বারা আমি এই গতির প্রকৃতি সম্বন্ধে এমন কতকগুলি জিনিষ আবিষ্কার করিয়াছি যাহা ইতিপূর্বে আর কেহ করেন নাই। ....পড়ন্ত বস্তুর গতি ও ত্বরণ সম্বন্ধে কেহ কেহ ভাসাভাসা ও খাপছাড়া কিছু পর্যবেক্ষণ করিয়াছেন বটে, কিন্তু এই ত্বরণের মাত্রা কিরূপ সে সম্বন্ধে কেহ কিছু এ পর্যন্ত বলেন নাই।’’ তখন পর্যন্ত যা কেউ বলেন নি সে কথা তিনি বলতে পেরেছিলেন আজীবন পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করে। অহরহ যা ঘটে তার মধ্যে প্রচছন্ন প্রকৃতির নিয়ম ও নীতি আবিষ্কার করা একমাত্র অনন্য সাধারণ প্রতিভার পক্ষেই সম্ভব।
ভাগ্যবিড়ম্বিত এই মনীষীর মৃত্যু হয় ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে। ঐ বছরেই জন্ম হয় আর এক বিজ্ঞান সাধকের। তিনি স্যার আইজাক নিউটন।