ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
আমরা বর্ধমান শহরে থাকি। বর্ধমান শহরটা যদিও শহর হিসাবে অতি পুরাতন তবু এই শহরে বর্তমানে বহু হাই-রাইজ হাউসিং গড়ে উঠেছে। মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনের ছোঁয়া পরিস্ফুট এই সব হাউসিং গড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে। আমরা আমার দাদুর বাবামশায়ের তৈরী এক পুরোনো দোতলা বাড়িতে থাকি। উপরে নীচে পাঁচখানা বড় বড় কামরা। আর সেই বাড়ির বাসিন্দা তিন জন--আমি, বাবা ও মা। নীচতলার একটা ঘর, রান্নাঘর, কাঠের আলমারি--সেই আলমারীগুলোর একটায় বাড়তি বালিশ, মশারী এবং অব্যবহৃত বড় বড় বিছানার চাদরগুলো রাখা থাকে। সেই ঘরটার দরজা সকালবেলায় খোলা হয় এবং বিকেল বা সন্ধ্যাবেলায় মা তালা লাগিয়ে দেয়। আমার খুব ভাল লাগে আমাদের বাড়ি--বাবারও অপছ¨ বলে মনে হয় না--কেবলই মা মাঝে মধ্যে বলে--‘‘বাবা, আর পারি না--এবার দেখে শুনে একটা ফ্ল্যাটে উঠে গেলেই হয়।’’ এই ছড়ানো ছিটানো বাড়িতে একতলা দোতলা করে হাঁপিয়ে উঠি। অবশ্য মা যাই বলুক না কেন--বাবা যে মোটেই তাতে কান দেয় না সে আমি বেশ ভাল করেই জানি।
হঠাৎ একদিন দেখি বিশাল বিশাল আলমারী তিনটের একটার পাল্লা একটুখানি খোলা। আমি ধরে নিলাম যে মা তাড়াতাড়িতে আলমারীর পাল্লাটা ঠিকমত বন্ধ করে নি কিন্তু আমার সরেজমিনে তদন্তের স্বভাবটাকে দমিয়ে রাখা গেল না--আমি সঠিক কারণ অনুধাবনের জন্য একতলার বাড়তি রুমটার ভিতরে ঢুকলাম। ঢুকতেই আমি খুব মিহিসুরে চিঁ চিঁ শুনলাম-- অল্প কিছুক্ষণ পরে চিঁ চিঁ শব্দটা মিঁ মিঁ শব্দে পরিণত হল কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু বোঝা যাচিছল না। আমি সতর্কভাবে আলমারীর পাল্লাটা আর একটু ফাঁক করে ভিতরে দেখার চেষ্টা করলাম কিন্তু কয়েকটা চাদরের উপরে দুটো বড় পুরানো সাদা মশারি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলাম না। আলমারী রহস্য ভেদ করার জন্য আমি আলমারীর পাল্লাটা চেপে বন্ধ করে মার কাছে যেতে মনস্থ করলাম। কিন্তু হা ঈশ্বর। আমি আলমারীর পাল্লাটা বন্ধ করতে চাইলেও সেটা একটু ফাঁক হয়েই রইল। আমি দরজা দিয়ে বেরিয়ে দোতলায় উঠতে যাচ্ছি--দেখলাম এক মোটা সাদা বিড়াল জানলা গলে বেরিয়ে আসছে। শব্দ রহস্য কিছুটা সমাধান হলেও আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হবার জন্য মার কাছে দৌড়ালাম। মাকে ব্যাপারটা বলতেই মা হাতের কাজ ফেলে নীচে নেমে এল। এসে পাল্লা খোলা আলমারীর নীচের তাক থেকে একটা বড় মশারি টেনে বার করল। ও মাগো! দেখি কি বড় মশারির উপর খুদে খুদে তিনটে লাল লাল ছানা। এখনও চোখ ফোটে নি। মার মতে বেড়ালটা অন্য কোথাও ছানার জন্ম দিয়ে এই সাফ সুতরো মশারিতে এনে তুলেছে। এখনও চোখ ফোটে নি কাজেই ওদের নড়ানো চলবে না--শুধুমাত্র ওর মায়ের আসা যাওয়াটা নিশ্চিত করতে হবে--তাহলেই মা বেড়াল ওদের ঠিকমত দুধ খাইয়ে দিয়ে যাবে। একটা কথা আমার মনে বারবার হচিছল--সে কথাটি মাকে না বলে পারছিলাম না--বেড়ালটাকে আমি লাফিয়ে জানলা দিয়ে যাওয়া আসা করতে দেখলাম কিন্তু তখন দরজাটা খোলা ছিল--সেদিকে ও তাকিয়েও দেখেনি। মা বাচচাগুলিকে মশারির উপর গুছিয়ে তুলে দিতে বলল--‘‘জানো কাল জয়শ্রী আসবে।’’ জয়শ্রী আমার জেঠতুতো বড়দি--এবার বি.এ. অনার্স পাশ করে যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে--এখনও ক্লাস শুরুর বেশ ক’দিন বাকী আছে তাই বর্ধমান আসবে। বড়দি এলে খুব মজা হয় তাই আমি আন¨ে হাততালি দিয়ে উঠলাম। মা আমার উচছ্বাসে রাশ টানতে বলল--‘‘জান তো জয়শ্রী ভীষণ টিপটপ থাকতে ভালবাসে--তুমি তোমার রুম গুছিয়ে রাখবে-- জয়শ্রীর যেন কোনরকম অসুবিধা না হয়।’’ আমি আগ্রহের সঙ্গে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। মা দরজা টেনে বেরিয়ে যেতে আগ্রহী হলে আমি মায়ের পশ্চাৎ অনুসরণ করে দোতলায় উঠলাম কারণ আমি নিশ্চিত বিড়ালটা কাছাকাছি কোথাও আছে এবং আমাদের চলে যেতে দেখলে নির্ঘাৎ চুপিচুপি এসে বাচ্চাগুলোর কাছে শুয়ে থাকবে। আমি খেয়াল করে দেখলাম বাচ্চাগুলোর কাছাকাছি হলেই ক্রুদ্ধ বিড়ালটার মুখটা কেমন মায়াময় নরম হয়ে ওঠে।
পরদিনই বড়দি মানে জয়শ্রী এসে গেল। কাঁধে একটা সাইড ব্যাগ ঝুলিয়ে সকাল সাড়ে নটা নাগাদ সে আমাদের বাড়ির দ্বারপ্রান্তে এসে উপস্থিত হল। আর সবার বাড়ির মত বিশেষতঃ ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর মত আমাদের বাড়ির দরজা সর্বদা বন্ধ থাকে না-- রাত আটটার আগে পর্যন্ত আমাদের দরজা খোলাই থাকে। যার যখন দরকার পড়ে সে দরজা ঠেলে ঢুকে আসে। প্রথমেই আসে কাগজওয়ালা শিবুদা--বিশেষ ভঙ্গীতে ‘কা-গো-ও-ওজ’ শব্দটা বলতে বলতে সে দোতলার বারা¨া তাক করে কাগজ ছুঁড়ে দেয়--দ্বিতীয় জন আসে দুধওয়ালা মাধবদা--দুধ মাপতে মাপতে সে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় দরজার শিকল ধরে নাড়া দেয়। তার শব্দটা শোনায় ঝন্-ঝন্-ঝনাৎ-এর পর আরও কতজন যে আসে কি বলব? আমি স্কুল যাওয়ার জন্য বেরিয়ে যাওয়ার পর মা নেমে এসে বড় দরজায় খিল দেয়--আবার বিকেলে আমি বা বাবা ফিরলে খিল খোলা হয়। বড়দি এসেই তার প্রথাগত সুরে আমাকে প্রথম বললে--‘‘কী কমরেড, এদিকের খবরাখবর কী?’’ বড়দির মুখে এই ‘কমরেড’ শব্দটা আমার মনে ঝড় তোলে--বড়দির বলার ভঙ্গিতে মনে হয় বড়দি আর বড়দি নয়--অনার্স পাস বড়দি আর সেভেনে পড়া আমি দুজনেই সমান। আমি বড়দির কাছ ঘেঁসে দাঁড়িয়ে যতটা পারলাম ইস্কুলের খবর দিলাম--বাড়ির খবর টুকটাক দিয়ে বড়দির হাত ধরে টান দিলাম বিড়ালের বাচ্চা দেখার জন্য। নতুন প্রাণের দর্শক বড়দি খুবই খুশি--আমাকে জিজ্ঞেস করল--এদের নাম কী রেখেছিস? ছোট্ট ছোট্ট প্রাণগুলি ছোট ছোট কুঁতকুঁতে চোখ মেলেছে দেখে আমি তো আনন্দে আত্মহারা, বললাম--‘‘ধবধবে সাদা মোটাসোটার নাম গোলু, সাদা-কালোয় ছোপ ছোপটার নাম পিলু, বাকিটার নাম এখনও রাখা হয়নি।’’ বড়দির মুখ খুশির হাসিতে ভরে গেল, আমার গাল দুটো নেড়ে বলল--‘‘ওরে তুই তো ওদের ডাকনামগুলো বললি--ভাল নাম রাখব। কিন্তু তুই ওদের দোতলায় তুলিস নি কেন? খাটুনির চেয়ে হাঁটুনি বেশী’’--চল চল ওদের দোতলায় নিয়ে যাই। বড়দি আসায় মা-বাবা খুশি, আমি খুব খুশি, বড়দি খুশি--খুশির হাওয়া যেন ঝলমল করছে চারিদিক। সেই খুশির আবহাওয়ায় আমি আর বড়দি মিলে বেড়াল বাচ্চা তিনটে আমাদের খাটে তুললাম--বাবা মার বিড়ালের প্রতি আগ্রহ খুবই কম--তিনি বললেন, ‘‘জয়শ্রী এল আর বিড়ালছানা এল--খুবই সুখবর।’’
সেদিন আমার আর স্কুল যেতে ইচ্ছ করছে না-- বড়দি বলল, ‘‘তাড়াতাড়ি তৈরী হয়ে নে, স্কুলে থেকে ফিরে অনেক গল্প করব--আর তোর কিউট ফ্রেন্ড দুটিকে একবার আসতে বলিস।’’ আমি বুঝলাম সুমনা আর আফসানার জন্য বড়দি বলছে। বড়দি এসেছে শুনলে বলা যায় না সুমনা, আফসানা তো আসবেই-- এমনকি আফসানার মাও চলে আসতে পারে। আফসানার মা জয়শ্রীদিকে খুব ভালবাসেন আবার তিনি কলকাতার মেয়ে বলে জয়শ্রীদির সঙ্গে একাত্মতা বোধ করেন।
সকালটা যে আজ কী তাড়াতাড়ি কেটে গেল তার ঠিক নেই। স্কুল টাইমটা আর কাটে না। টিফিনে ক্লাসের সহপাঠীদের কারো আর জানতে বাকী রইল না আমাদের বাড়ি কী অমূল্য রতন পেয়েছে?
স্কুল ছুটি হয়ে বাড়ি যেতেই বড়দি বলল--শোন তোর ডাকনামগুলো যেমন আছে তেমনই থাক--বরং তিন নম্বরটার ডাক নাম দে ডালু। আমি ওদের সব ভাল নাম রেখেছি ক্যাটলিনা, হাথওয়ে, ক্রিস্টিনা। তারপর বলল--জানিস তো বিদেশে সব পোষ্যদের নামে কার্ড থাকে, আর সেই কার্ডের সব ভিন্ন ভিন্ন নম্বর। সেই নম্বর বলতে না পারলে ওদের কোন ভেট হসপিটালে ভর্তি করা হয় না কাজেই বুঝতে পারছিস ওদের নাম এবং নম্বর কতটা জরুরী।’’ বড়দি আরও বলল--আরও শোন আমি ওদের নিয়ে একটা কবিতাও লিখেছি--চল ওদের সামনেই একটু বলে শোনাই, বলে আমার মধ্যমাটি ধরে বেড়ালের বাচ্চাদের সামনে দাঁড় করিয়ে তার নাইটির পকেট থেকে একটা চিরকুট বের করে তার রিনরিনে মায়াবী গলায় পড়তে শুরু করল :
‘‘ছোট্ট তিন বিড়ালছানা,
ক্যারোলিন, হ্যাথওয়ে, ক্রিস্টিনা।
তাদের আছে দস্তানা,
উজ্জ্বল নানান রঙ বোনা।
একই মায়ের তিনটি ছানা
ক্যারোলিন, হ্যাথওয়ে, ক্রিস্টিনা।।’’
আর আমার জগতটা রামধনুর সাতটা রঙে বোনা হয়ে গেল।