ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
শ্রাবণ মাস। তুমুল বৃষ্টিতে মাঠ-ঘাট ডুবে গেছে। সন্টেদের বাড়ির পাঁচিল ঘেরা খিড়কি পুকুরটা জলে থই থই করছে। পুকুরের পাড়ে ঘাটের ধারে জোড়া তালগাছটায় অসংখ্য বাবুই পাখির বাসা। ঝোড়ো বাতাসে বাসাগুলো দোল খাচ্ছে, পাখিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে। সারা রাতের মেঘ-মাদলের বাজনা শুনিয়ে, ঝম্ ঝমা ঝম্ জল-নূপুরের নাচ দেখিয়ে, বর্ষা রানি এখন একটু ক্লান্ত হয়েছে। পূব আকাশে মুচকি হেসে একফালি রোদের আদর মাখিয়ে, সূর্যিঠাকুর সকাল সাতটার সময়, সন্টেদের খিড়কি পুকুরের পূবপাড়ের নারকেল গাছগুলোর ঝিলমিল পাতার আড়ালে, একটু মুখ দেখিয়েছেন যখন; সন্টে তখনো বিছানায় শুয়ে।
সে শুয়ে শুয়েই ডাক শুনলো মায়ের--‘সন্টে, উঠে আয়; আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে, স্কুলে যেতে হবে; মুখ, হাত ধুয়ে পড়তে বোস।’ বাদলের রাতে, নিটোল ঘুমের আমেজে সন্টের বিছানায় শুয়ে থাকার আনন্দ; মায়ের এক ডাকেতেই পানসে হয়ে গেল। সূর্যি-ঠাকুরের উপর খুব রাগ হলো সন্টের। কি দরকার ছিল, আজ মেঘের আড়াল থেকে মুখ দেখাবার? মেঘগুলোর উপরেও ভারি অভিমান হলো তার। রাতের মতো দিনেও যদি আরো কিছুক্ষণ জল ছড়াতো, তবে আজ নিশ্চয়ই স্কুল যেতে হতো না। অবশ্যই ‘রেনি ডে’ হতো আজকের দিনটা।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও সন্টে উঠে এলো বিছানা থেকে। দেখল, সত্যিই পূবের আকাশ পরিষ্কার হয়েছে; সূর্যি ঠাকুরও হাসছেন দুষ্টুমি করে। অগত্যা মুখ-হাত ধুয়ে, চা-মুড়ি খেয়ে পড়তে বসতেই হলো। আবার পড়াশুনা হয়ে গেলে স্নান সেরে সাড়ে নটার সময়ে ভাত খেয়ে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে, ছাতাটাও নিয়ে বের হতেই হলো স্কুলের দিকে।
সন্টেদের বাড়ি থেকে অমরপুর স্কুল প্রায় দু-মাইলের কাছাকাছি। বাড়ির কাছে দুলে পাড়া পার হয়ে পশ্চিমে মাঠ। মাঠের মাঝ দিয়ে বয়ে যাচেছ ডোমকুড়ো খাল। খালে বাঁশের পুল পার হয়ে আবার মাঠ। তারপর সরকারের ক্যানেল। ক্যানেলের বাঁধ ধরে গিয়ে আবার একটা মাঠ পার হয়ে দামোদর নদের বিরাট বাঁধ। উঁচু বাঁধ দিয়ে দুষ্টু দামোদরকে সামলাবার চেষ্টা করা হয়েছে। তবু দুরন্ত দামোদর বেশ কয়েকবার বাঁধ ভেঙে তোলপাড় করে গেছে বর্ধমান, হুগলী, হাওড়া জেলাকে। দামোদরের পশ্চিম পাড়ে অমরপুর স্কুল।
আজ সন্টের সঙ্গী ছেলেগুলো--সুনীল, খোকন, বাসুদেব, দিলীপরা মনে হয় স্কুলে যাবে না। সন্টে মন খারাপ করেই চলতে লাগল দুলে পাড়া পার হয়ে মাঠের আলপথ ধরে। এমন সময় শুনতে পেলো দিলীপ চেঁচাচ্ছে দুলে পাড়ার কাছে--‘সন্টে, দাঁড়া... দাঁড়া।’
সন্টে পিছনে তাকিয়ে দেখল--দিলীপ ছুটতে ছুটতে আসছে। সন্টেও থমকে গেল। দিলীপ হাঁফাতে হাঁফাতে এসে বললো--‘দেখ না দেরী হয়ে গেল। আজ স্কুলে যেতে একদম ভাল লাগছে না; মায়ের বকুনি খেয়ে তবে এলুম।’ সন্টেও বলল--‘আমারও ভালো লাগছিল না, মা বকাবকি করলো তাই!’
দুজনে কথা বলতে বলতে মাঠের আলপথ ধরে এসে পড়েছে ডোমকুড়ো খালের কাছাকাছি। এখানটায় একটা বড় নালা দিয়ে ধানজমির বাড়তি জল খালটায় গিয়ে মেশে। রাতের বৃষ্টি থামলেও ধানজমির জল নালাটা দিয়ে হুড় হুড় করে খালটায় গিয়ে পড়ছে এখানে। খালের কৈ, মাগুর, শিঙি, পুঁটি, ল্যাটা, চ্যাঙ্ এমন কি অন্য মাছেরাও জলের স্রোতের বিপরীতে পাড়ি দিয়েছে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে। নালার জল কাটিয়ে তাই তারা উঠে আসছে ধান জমির দিকে। নালাটার পাশ দিয়ে আসার সময় সন্টে দেখল নালার ধারে একজায়গায় নরম মাটি খসে গিয়ে একটা গর্ত হয়েছে; আর সেখানে গোটা কতক কৈ মাছের ছোট ছানা খেলা করছে। সন্টের খুব ইচছা হলো তখুনি জলে নেমে ধরে ওদের। সে খুব উৎসাহের সঙ্গে দিলীপকে বলল--‘দ্যাখ্...দ্যাখ্; কৈ মাছের ঝাঁক!’ দিলীপও দেখতে পেয়েছে মাছগুলোকে, বলল--‘স্কুল থেকে ফেরার সময় ধরতে হবে ওদের।’ সন্টেও সায় দিল দিলীপের কথায়।
মাছ ধরার স্বপ্ন নিয়েই তারা এগিয়ে চললো স্কুলের পথে। এদিকে ডোমকুড়ো খালের অবস্থা তখন বেশ ঘোরালো। এক বুক জল নিয়ে সে লাফাতে লাফাতে ছুটে চলেছে দক্ষিণের দিকে। তার বুকের উপর নড়বড়ে বাঁশের সেতুটাকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলতে চাইছে সে! সন্টে ও দিলীপ ভয়ে ভয়ে সেতুটা পার হয়ে, মাঠ পেরিয়ে, ক্যানালের বাঁধ ধরে দামোদরের বড়ো বাঁধের কাছে এসে হাজির হলো। দামোদরের বাঁধের উপরে উঠে দ্যাখে দামোদরের জলও এই কয়দিনের বৃষ্টির জলে ও ব্যারেজ থেকে জল ছাড়ার ফলে বেশ বেড়ে গেছে। পারাপারের নৌকোটায় তিল-ধারণের জায়গা নেই। বেশির ভাগ লোকই আঁটপাড়া হাটের ফিরতি লোক। স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা কেউ নেই। শুধু বাংলার মাস্টারমশাই শিবসাধন বাবু আর ভূগোলের মাস্টারমশাই জগন্নাথ বাবু ওপারে স্কুলে চলেছেন। জগন্নাথ বাবু সন্টেদের দেখে বললেন--‘ওরে তোদের আজ স্কুলে যেতে হবে না; দেখছিস না নদীটা কতো বেড়ে গেছে! বন্যা হবে মনে হয়; আজ রেনিডে তোদের।’ এই কথা শুনে সন্টে আর দিলীপের তো মহাফূর্তি! দুর্যোগের দিনেও মায়ের তাড়নায় তাদের স্কুল যেতে হচ্ছিল। এবার জল-কাদা মেখে বাড়ি ফিরে বলবে--‘মা, স্কুলে ছুটি দিয়েছে; আজ রেনিডে।’
সন্টের আর তর সইছিল না। সে দিলীপকে বললো--‘তাড়াতাড়ি ফিরে চল; সেই কৈ মাছগুলোকে ধরে নিয়ে বাড়ির পুকুরে ছাড়বো।’ এবার সন্টেরা মহা আনন্দে বাড়ি ফিরতে লাগলো, রাস্তার জল কাদাকে উপেক্ষা করে। মাঠ-ঘাট পার হয়ে এসে দেখল--ডোমকুড়ো খালের সেতুটাকে খালের জল প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। তাই সাবধানে তারা বাঁশের সেতুটা পার হলো। দেখলো--সেই কৈ মাছগুলো খেলা করছিল সেখানেই রয়েছে। সন্টে তো বেজায় খুশি। সে দিলীপের হাতে বইয়ের ব্যাগটা দিয়ে বললো--‘দ্যাখ্ দিলীপ, সেই মাছগুলো! ধরবো ওদের। তুই আমার ব্যাগটা ধর।
দিলীপের হাতে বইয়ের ব্যাগটা দিয়ে সন্টে নালায় নামলো। জলের স্রোতে, তার পা টলমল করছিল। তবুও ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই কাদামাটির গর্ত থেকে একটা ছোট কৈ মাছকে সে পাকড়াও করলো দুই হাতের মুঠোয়। নালার জলে তার জামা-প্যান্ট ভিজে একাকার। দিলীপ তার অবস্থা দেখে হাসছিল যখন; সন্টে বলল--‘হাসছিস যে ভারি, একটা কচুপাতা ছিঁড়ে দে, আমাদের খিড়কি পুকুরে এটাকে ছাড়বো; অনেক বড়ো হবে।’
দিলীপ আলপথের পাশে জন্মানো কচুবন থেকে একটা কচুপাতা ছিঁড়ে সন্টেকে দিলো। সন্টে কচুপাতার মধ্যে মাছটাকে রেখে, নালা থেকে উঠে এলো কাদা- জল মেখে। দু-হাতের মধ্যে কচুপাতায় জড়ানো কৈ মাছের ছানাটা তখন ছটফট্ করছে। দিলীপ বললো-- ‘সন্টে, মাছটা মরে যাবে রে; কচু পাতায় একটু জল ভরে নে।’ দিলীপই দু-হাতের আঁজলায় কিছুটা জল দিল কচুপাতার মধ্যে। কচুপাতার মধ্যে জলটুকু পেয়ে ভিতু ছোট মাছটা আর ছটফট্ করছিল না।
এবার সন্টেরা বাড়ির দিকে ফিরছিল যখন আবার আকাশ কালো করে মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে। রাস্তার জল-কাদা অগ্রাহ্য করে তারা লাফাতে লাফাতে চললো বাড়ির দিকে। বাড়িতে ঢোকার আগে সন্টে দেখল--দিলীপ ইচ্ছে করে খানিক কাদা-জল জামা-প্যান্টে লাগাচ্ছে। সন্টে হাসছে দেখে দিলীপ বললো-- ‘মাকে বলবো রাস্তায় পড়ে গেছি; আজ স্কুলে রেনিডে দিয়েছে।’ রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দিলীপ পিছন ফিরে বলল--‘সন্টে, মাছটা বড়ো হলে আমায় দেখাবি কিন্তু!’ সন্টে ঘাড় নাড়ালো।
বাড়িতে ঢুকে সন্টে সোজা খিড়কি পুকুরের ধারে সান বাঁধানো ঘাটে গিয়ে হাজির। কচু পাতার ভিতর ছোট্ট কৈ মাছের ছানাটা তার দু-হাতের মুঠোর মধ্যে। কচু পাতাটা একটু ফাঁক করে, ভালো করে সে দেখল কৈ মাছটাকে। কী আশ্চর্য! এটা যে ঠাকুমার পাশে বসে দেখা মহাভারতের সেই ছবির মাছটার মতো অবিকল দেখতে। সেই রকম শিং রয়েছে মাছটার। সন্টের মনে পড়লো ঠাকুমার কথা--‘না, না সন্টে; এটা মাছ নয়; এটা--‘মৎসাবতার!’
সন্টের ঠাকুমা প্রতিদিন দুপুরবেলায় দালানে বসে মহাভারত পড়ে। সন্টেও ঠাকুমার পাশে মহাভারতের অপূর্ব সুন্দর ছবিগুলো দেখার লোভে বসে থাকে। একদিন ঠাকুমা দেখিয়েছিলেন সেই ছবিটা এক ঋষি নদীর জলে দাঁড়িয়ে তর্পণ করছেন। তাঁর দু-হাতের অঞ্জলির মধ্যে একটা ছোট্ট মাছ; ঠিক সন্টের মাছটার মতো।
সন্টে, ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করেছিল--‘ঠাকুমা, ওটা কী মাছ?’ ঠাকুমা বলেছিলেন--‘‘না-না, ওটা মাছ নয়;--ওটা ‘মৎসাবতার’! অনেক বড়ো হয়ে পৃথিবীকে আর পৃথিবীর সব প্রাণীদের রক্ষা করেছিলেন। পৃথিবীটা একবার মহপ্লাবনে বন্যার জলে ডুবে যাচিছল। ঐ মৎসাবতার এসে সকলকে রক্ষা করেছিলেন।’’
সন্টের মনে পড়লো--ভূগোলের মাস্টারমশাই জগন্নাথ বাবুর কথা--‘বন্যা হবে মনে হয়!’ খিড়কি পুকুরের ঘাটে দাঁড়িয়ে, সন্টে তার হাতের মুঠোর মধ্যে ধরা কচুপাতটা আলগা করে ছোট্ট কৈ মাছটাকে একবার দেখলো। তারপর মাছটাকে পুকুরের জলে ছেড়ে দিয়ে বলল--‘তুমি ঠিক সেই মৎসাবতার! বন্যা হবে মনে হচ্ছে, আমাদের রক্ষা কোরো!’
সন্টের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে কৈ মাছটা পুকুরের জলে ডুব দিল; কিন্তু একটু দূরেই সে তিড়িং করে লাফ দিয়ে সন্টেকে একবার দেখা দিয়ে আবার ডুব দিল জলের মধ্যে। সন্টে ভারি আশ্চর্য হয়ে ভাবতে লাগলো--মাছটা নিশ্চয় ‘মৎসাবতার’! আমার কথা শুনতে পেয়েছে। বন্যা হলে ঠিক রক্ষা করবে আমাদের।