ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
কৈলাসে নিজের গুহার সামনে বসে মহাদেব মৌতাতে একটু ঢুলছিলেন। হঠাৎ একটা হট্টগোলের শব্দে চমকে উঠলেন।
শিব : ওরে নন্দী, ও ব্যাটারা আবার হিমালয়ের পাহাড় ভাঙ্গার জন্য ডিনামাইট চার্জ করছে নাকি?
নন্দী : না ঠাকুর। মা জননী রাগ করে এদিকে আসছেন।
দুর্গা (রেগে) : তুমি কি সারাদিন চোখ বুজেই থাকবে? এই অনাচার দেখতে পাও না?
শিব : আহা, হল কি?
দুর্গা : সাত সকালে একটু গোমুখের দিকে হাঁটতে গেছিলাম--তা কি ঘেন্না! হতচ্ছাড়ারা সেখানে প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট, তারপর ঐসব জঘন্য জিনিসের কাঁচের বোতল ফেলে গেছে। ভক্তি না ছাই! তীর্থে পুন্যি করতে এয়েছে না পাপ!
শিব : তীর্থে এসে ওরা প্রতিদিন চার টন করে এইসব নোংরা ফেলে যায়। (১)
ভৃঙ্গি : মা ভাগীরথীতে ডুব দিতে গিয়ে দেখি সেখানে আশেপাশের আশ্রম আর হোটেলের ড্রেনের ময়লা ফেলা হচ্ছে।
নন্দী : আজকাল মাগো প্লাস্টিকের ফুল, প্লাস্টিকের প্যাকেটে ফুল সব ঐ গঙ্গোত্রী যমুনোত্রীর মন্দিরে! (ইতিমধ্যে গঙ্গা দেবীকে নিয়ে বরুণ এলেন। তারপর একে একে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রামচন্দ্র, শ্রীকৃষ্ণ, ধরণী, যমরাজ সকলেই এসে হাজির।)
গঙ্গা : হে দেবাদিদেব, একটা কিছু করুন। নইলে যেভাবে গোমুখের গ্লেশিয়ার গলতে আরম্ভ করেছে তাতে কয়েক বছর বাদে শুধু ম্যাপের পাতাতেই আমি টিকে থাকব।
শিব : জানি। ২০০০ থেকে ২০২৩ এর মধ্যে কারাকোরামের গ্লেশিয়ার অনেকখানি গলে গেছে। (১)
গঙ্গা : ২০১৩-তে কেদারনাথে যে সব্বেনাশ হল, সব্বাই দোষ দেয় যে মন্দাকিনীর জল প্রলয়ে অত মানুষের প্রাণ গেল। তা কি আমার দোষ, না আমার কপাল?
ব্রহ্মা : মূর্খেরা তোমায় দোষ দেয়? এসব ম্যান মেড। মনুষ্য কর্তৃক। পাহাড় ভাঙছে, গ্লেশিয়ার গলছে। ফলে গান্ধী সরোবর হ্রদে চাপ বাড়ছে, পাহাড়ের বাঁধন ভেঙে যাচ্ছে। উত্তরাখণ্ডে সড়ক আর হোটেল তৈরি করার নামে গাছ কাটার বিরাম নেই। গাছের শেকড় পাহাড়কে মাটিতে আঁকড়ে ধরে রাখে। সে না থাকলে পাথর আলগা হয়ে যায়।
গঙ্গা : ‘‘বারে বারে বাঁধ ভাঙিয়া বন্যা ছুটেছে।/ দারুণ দিনে দিকে দিকে কান্না উঠেছে''। (২)
বরুণ : লোকে আবার আদিখ্যেতা করে আমাকে বলে জলের দেবতা বরুণ। নিকুচি করেছে তাদের। গত বিশ বছরে সমুদ্রের অর্ধেক জল অক্সিজেনের অভাবে সবুজ হয়ে গেছে। (৩) সামুদ্রিক জীবজন্তু, বনস্পতিদের রং পাল্টে যাচ্ছে। উষ্ণতার বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক আবাস শেষ হওয়া এবং দূষণের দরুন তারা এভাবে অ্যাডাপ্ট করছে। স্ট্রাগল ফর একজিসটেন্স। বাঁচার লড়াই। বায়োডাইভার্সিটি এন্ড কনজার্ভেসন স্টাডিতে বলছে--আমাজন অরণ্যে জঙ্গল কাটার ফলে প্রজাপতিদের রং ফিকে হয়ে গেছে। জঙ্গলে গাছ কমে গেলে চট করে শিকারী পাখিদের নজরে পড়ার সম্ভাবনা, তাই। রংবেরঙের প্রজাপতি আজ ধূসর। ভারতের আন্দামান, নিকোবর, লাক্ষাদ্বীপ, গল্ফ অফ কচ্ছ ইত্যাদি জায়গায় সামুদ্রিক প্রবাল/ কোরাল এই তাপে ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে। কারণ সেখানে শৈবাল শেষ। এই শৈবাল কোরালের খাদ্য। এ না পেলে প্রবালের বাঁধন দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়বে। সমুদ্র এসে গিলে খাবে তটবর্তী মানুষের বাস্তুভিটে। (৩) তখন? আর প্লাস্টিক? সে তো সমুদ্রের তলদেশে আরেক সমুদ্র।
দুর্গা : আমাকেও সিংহবাহিনী নাম দিয়েই সবাই খালাস। একশো বছর আগে আফ্রিকা এশিয়া মিলিয়ে পৃথিবীতে দুই লাখ সিংহ ছিল। এখন আফ্রিকাতে ২০-২৫,০০০। হ্যাঁ, ভারতে উনবিংশ শতাব্দীর শেষে ছিল ২০-৩০টা। তা বেড়ে হয়েছে ৬০০। ঐ গির অরণ্যের দরুন। আর বাঘেদের সংখ্যা? ১৯০০ সাল নাগাদ সারা বিশ্বে এক লাখ। ২০০০ সন আসতে আসতে তা হলে গেল ৩-৪০০০। বালি, জাভা আর ক্যাপ্সিয়ান টাইগার তো অদৃশ্য। হ্যাঁ, ভারতে বাঘেদের সংখ্যা বেড়ে ২০২২-এ হয়েছে ৩,১৬৭। ঐ অভয় অরণ্যের কল্যাণে। তাদের সংখ্যা কমে যাবার কারণ একই-- ১) প্রাকৃতিক আবাসের অভাব, ২) ঘাস নেই তাই হরিণ, নীলগাই, আফ্রিকাতে জেব্রা ইত্যাদি শিকারের অভাব, ৩) পেটের জ্বালায় মানুষের বসতিতে ঢুকলে ফাঁদে পড়ে, গুলিতে বা বিষে মৃত্যু, ৪) একযুগে বীরত্ব দেখাতে এদের শিকার তো কম করা হয়নি! (১)
বিষ্ণু : ওদিকে পুরনো ধাঁচের বাড়ি লোপাট হচ্ছে। এখন সব দেশলাই বাক্সের মত ফ্ল্যাট। চড়ুইরা বাসা বাঁধে কোথায়? তারপর তো ক্ষেতে পেস্টিসাইড (কীটনাশক) স্প্রে। ফ্ল্যাটের বারান্দায় কাঁচ, হাওয়ায় গরল। দিল্লীর এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স দেওয়ালিতে ৪৫০ হয়ে যায়। (৪) দিন দুপুরে ধোঁয়াশা। এবার সবাই রাস্তায় বেরুবার সময়ে পরনে কিছু দিক না দিক মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে বেরুবে। চড়ুই পোকা মাকড় খেয়ে পরিবেশ সুস্থ রাখত। বিশে মার্চ ওয়ার্লড স্প্যারো ডে উদযাপন করলেই পাপস্খালন হয়ে যাবে? পাখিরা বাঁচবে?
যম : আমি যমরাজ। আমাদের ডিপার্টমেন্টের নাম মৃত্যু। তা, ১৯৯০ থেকে আজ পর্যন্ত ৯৫-৯৯ শতাংশ শকুনি শেষ। পশুদের ব্যথার জন্য ডাইক্লোফিন্যাক ইঞ্জেকশন দেওয়া হত। সে পশু মারা গেলে তা খেয়ে শকুনদের পরলোক প্রাপ্তি। হোয়াইট রম্পড ভালচার, ইনডিআন ভালচার, স্লেনডার বিলড ভালচার--এখন শুধু সালিম আলির বইতেই হয়ত মিলবে। (১) তারা মৃত পশু খেয়ে জঙ্গল, শহর-গ্রাম, নদীর তীর পরিচ্ছন্ন করে রাখত। এখানেই শেষ নয়। শকুন নেই তো রাস্তার কুকুরেরা এসব খেতে আরম্ভ করেছে। তারা কামড়ালে জলাতঙ্ক, রেবিস। প্রকৃতির ভারসাম্যই বজায় থাকছে না। সুপ্রীম কোর্ট তো আদেশ দিয়েই খালাস : ইনসানোঁ কো বাচানে ওয়াস্তে কুত্তোঁ কো মার ডালো! আরে বাবা, এদেরই একজন স্বয়ং যুধিষ্ঠিরকে মহাপ্রস্থানের পথে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছিল।
শ্রীকৃষ্ণ : আমার মাথায় থাকে ময়ূরের পালক। তা, সেই ময়ূরের অবস্থাও চিন্তাজনক। ওদিকে আরাবল্লী পাহাড় ভাঙছে। ফলে পাকিস্তান থেকে গরম হাওয়া এসে একদিন সমস্ত এলাকাটাকে থর মরুভূমিতে রূপান্তরিত করে দেবে। তখন লোকে আমার ছবিতেই শুধু ময়ূর দেখতে পাবে আর ঐ সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’য়।
যম : শুধু তাই নয়। দস্তা মাইকার লোভে আরাবল্লীতে বিস্ফোরণ ঘটাবার দরুন রাজস্থানের হাওয়ায় ধুলো, পাথরের গুঁড়ো ছড়িয়ে যাচ্ছে। সেখানে সিলিকোসিস, টিউবারকিউলোসিস ও অন্যান্য শ্বাসের রোগ, চর্ম রোগ, হার্ট ডিজিজ ইত্যাদির প্রাদুর্ভাব ঘটছে। মাটিতে জলের স্তর অনেক নেমে গেছে।
শিব : জলের কথা কি আর বলছ? এককালে আমার কাশীর নাম ছিল আনন্দকানন। সেখানে ৮০-১০০টা দিঘি ছিল। এখন সেসব শুধু নামেই আছে। অগস্ত কুণ্ডু, মছোদরি (সরোবর), রেওড়ি তালাও। কিন্তু সে তালাও আর কোথায়? কোথাও বাড়ি, কোথাও ন্যাড়া মাঠ। বেঙ্গালুরুতেও নাকি এককালে আটশো লেক ছিল। এখন বোধহয় ১৯৮। (৪)
বিষ্ণু : গুজরাতের ভালসাডে খাবার জল আনতে মহিলাদের ৪৫ ফিট গভীর কুয়োতে নড়বড়ে সিঁড়ি বেয়ে প্রতিদিন নামতে হয়! কতবার তো তারা পড়ে হাত-পা ভেঙে বসে থাকে! (৫)
দুর্গা : লোকে তো তোমায় ত্রিলোচন বলে। একবার ঐ ত্রিনেত্র খুলে পাপীদের ভস্ম করতে পারো না? তাহলে তো পৃথিবী রক্ষা পায়।
শিব : তোমাকেও তো সবাই অসুরনাশিনী বলে, তা তুমি ঐ প্লাস্টিকাসুরকে বধ করছ না কেন?
দুর্গা : ব্যাস, ঐ তক্কোবাগীশ হতেই পারো। ভস্মাসুরকে তো এমন বর দিলে যে সে তোমাকেই ভষ্ম করার জন্য তাড়া করেছিল।
বিষ্ণু : আহা কর কী? পরিবেশে কালিমা ছড়ালে কি আর মনটা নির্মল থাকতে পারে?
রাম : এই যে আমি দশরথ পুত্র রামচন্দ্র--আমার নাম করে সব কি খুনোখুনিই না করে বেরাচ্ছে। কোন বাদশা কবে কোন মন্দির ভেঙেছে, কে আমার জন্মস্থানে মসজিদ বানিয়েছে তো সেখানে আমার নামে মন্দির বানাতে গিয়ে কত না হত্যা হল। আর তোমরা যে মহারাষ্ট্রের গডচিরউলিতে মাড়িয়া গোণ্ড আদিবাসীদের আরাধ্য পাহাড় এক মাইনিং কোম্পানির হাতে তুলে দিচছ? ঝাড়খণ্ডের পারসনাথ পাহাড় হল জৈনদের পীঠস্থান। আদিবাসীরা তাকে মারাং বুরু দেবতা জ্ঞানে পুজো করে। সেটাও তো ট্যুরিজমের নাম করে শেষ করার তালে আছ? (১)
ব্রহ্মা : ১৮৩৯-এ চার্লস গুডইয়ার সালফারের সাথে প্রাকৃতিক রাবার গরম করে টায়ার বানাবার পথ প্রশস্ত করলেন। শুরু হল ভাল্কানাইজেশন প্রক্রিয়া। তারপর বিলিয়ার্ড খেলার বলের অভাব দেখা দিল। কারণ সে বল তৈরী হত হাতির দাঁত থেকে। ওদিকে শিকারের ঠেলায় হাতির অভাব! যারা জবর দখল করতে আফ্রিকায় গেছিল তাদের হাতে তো বন্দুক ছিল। তা দিয়ে তারা যেমন মানুষ মেরেছে, তেমনি হাতি শিকারও করেছে। তখন, ১৮৬৯ সালে জন ওয়েসলি হায়াত প্লাস্টিকের বিলিয়ার্ড বল তৈরি করলেন। এইভাবে শুরু হল প্লাস্টিকের জয়যাত্রা আর প্রকৃতির সর্বনাশ।
বিষ্ণু : ঐ ঝাড়খণ্ডের জামতারা আজ সাইবার ক্রাইমের রাজধানী। কিন্তু কেন ঐ গরীব আদিবাসীরা এ পথে এলো? মাইনিঙের জন্য জমি গ্রাস, ক্ষেতে উর্বরা শক্তির হ্রাস, জলের অভাব, যে জঙ্গল থেকে তারা ফল মূল জ্বালানী যোগাড় করত সেখানে তাদের নো এন্ট্রি! তাদের প্রাচীন পূজা ইত্যাদি নিশ্চিহ্ন করে দিচেছ। তাদের আরাধ্য পাহাড় বুঢ়া বাবা, তাদের সংস্কৃতি বিপর্যস্ত। তাহলে? (১)
ধরণী :
বুকের মাঝে জমল ক্রমে অনেক দুখের ভার
প্লাস্টিকেরই পাহাড় হল, সইতে নারি আর।
জলের সুধা বিষ হয়েছে, উধাও সবুজ ছায়া
ভাঙছে পাহাড়, পাষাণ বুকে নেই এতটুকু মায়া।
কাঁদছে সাগর, মরছে কোরাল, আরও নোনা পানি
স্থলে জলে হারিয়ে গেল আমার বুকের প্রাণী।
ওরে আমার সোনার বাছারা, তোমরা লেখা পড়া শিখে অনেক বড় হবে। তোমরা এই পৃথিবীকে, আমার আকাশ, বায়ু, বন জঙ্গল, পশু পাখি কীট পতঙ্গ আর মানুষদের রক্ষা করতে পারবে না?
সবাই মিলে : রক্ষা করো সবাই মিলে, দেব্তা অসহায়/বিষ ছড়ালো চরাচরে, মানুষ ছুটে আয়!
কৃতজ্ঞতা স্বীকার :
১) চ্যাট জিপিটি
২) রবীন্দ্রসঙ্গীত : নয় নয় এ মধুর খেলা
৩) দি হিন্দু সাইন্স : ১২.০২.২৬
৪) গুগল
৫) বি বি সি -- হিন্দী ১৮.০৫.২৬