ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
বেণুদের বাড়ির বাঁধানো উঠোনের পশ্চিমে, পাঁচিলের গায়ে শুধু একফালি মাটির অবকাশ। আর সেই মাটিটুকুই বেণুর মায়ের ভালোবাসার জায়গা। বেশ কিছুদিন হলো ঐ ফাঁকা জায়গাটাতে বেণুর মায়ের ভালোবাসার স্পর্শে ঝামরিঝুমরি হয়ে বেড়ে উঠছিল একটা গন্ধরাজ ফুলের গাছ। ঢলঢলে সবুজ পাতাগুলো দিয়ে গাছটা নিজেকে সাজিয়ে তুলছিল মনের আনন্দে। গেরুয়া রঙ করা দোতলা বাড়ির পাঁচিলের গায়ে সবুজ চিকন পাতায় মোড়া গন্ধরাজ গাছটা যেন মূর্ত একটা প্রকৃতির প্রতিবাদ। ইঁট-কাঠ-পাথরের অহঙ্কার ও জড়ত্বের মধ্যে ঐ সবুজ গাছটা যখন সূর্যের আলো গায়ে মেখে মৃদু বাতাসে পাতা দোলায়, মনে হয় মা যেন তার ছেলেকে আদর করছে!
শীত শেষ হয়ে বসন্ত এলো যখন, বেণুদের বাড়ির বাইরে শ্বেতকরবী, কূর্চি, টগর, যুঁই গাছগুলোয় ফুলের কুঁড়ি ধরছিল হৈ হৈ করে। শুধু ঐ গন্ধরাজ গাছটাতে কোন ফুলের কুঁড়ি ধরলো না! বেণুর মা রোজ হা-পিত্যেশ করে তাকিয়ে থাকে গাছটার দিকে। কখন একটা কুঁড়ি ধরবে; একটা ফুল ফুটবে সবুজ পাতায় ঢাকা গাছটার কোল জুড়ে!
সেদিন সোমবার, বেলা দশটা; সূর্যের আলোয় ঝলমল করছিল গন্ধরাজ গাছের পাতাগুলো। এমন সময় একটা মিষ্টি শব্দ--‘টুই...টুই...!’ বেণুর মা রান্নাঘরের জানলার ফাঁকে চোখ রেখে দেখল একটা ছোট্ট টুনটুনি পাখি এসে বসেছে পাঁচিলের উপর। পাখিটা ঘাড় কাত করে দেখছে গন্ধরাজ গাছটাকে। আবার সেই মিষ্টি শব্দ--‘টুই...টুই...!’ এবার পাখিটা উড়ে গিয়ে বসল গন্ধরাজ গাছটার ডালে। গাছটার সবুজ পাতায়, ডালে ঠোঁট ঠেকিয়ে কত আদর করছিল পাখিটা; গাছটার প্রত্যেকটা ডালে নেচে নেচে, ঠোঁট ছুঁইয়ে কি যেন পরখ করছিল সে। আর গন্ধরাজ গাছটাও আনন্দে দুলে দুলে উঠছিল!
বেণুর মায়ের মনে হল পাখিটা ঠিক মেয়ে পাখি; গন্ধরাজ গাছটাতে বাসা বাঁধবে বলে গাছটার সঙ্গে ভাব জমাতে এসেছে; আর ঠিক তাই!
পরদিন মঙ্গলবার। সকালের আলো ফুটতে না ফুটতেই পাখিটা এসে হাজির। বেণুর মা তখন সবে তুলসী আর মনসাগাছের পাশে গোপালঠাকুরের বাঁধানো বেদীটা জল দিয়ে ধুয়ে পরিস্কার পরিচছন্ন করে রাখছে। ফুল-জল-বাতাসা দেবে গৃহদেবতা পাঁচুগোপালের কাছে। এমন সময় সেই--‘টুই...টুই’ শব্দ করে পাখিটা সোজা এসে ঢুকে পড়ল গন্ধরাজ গাছটার সবুজ পাতায় ছাওয়া ঝোপের মধ্যে!
একটু দূরে দাঁড়িয়ে বেণুর মা দেখল, পাখিটা তার ছোট্ট ঠোঁট দিয়ে কি আশ্চর্য্য কৌশলে নিপুণভাবে গন্ধরাজ গাছের দুটো পাতা সেলাই করছে! একটু পড়েই ‘টুই...টুই’শব্দ করে টুনটুনিটা উড়ে গেল পাঁচিলের বাইরে। বেণুর মা-ও এসে বসল তার রান্নাঘরে।
রান্নাঘর থেকেই বেণুর মা লক্ষ্য রাখল, বেশ কয়েকবার টুনটুনি পাখিটা তার সাধের গন্ধরাজ গাছটার পাতার ঝোপের মধ্যে আসা-যাওয়া করলো। পরদিন বুধবার, বেণুর মা সকালবেলা গোপালঠাকুরকে ফুল-জল-বাতাসা দিতে গিয়ে একবার তাকালো গন্ধরাজ গাছটার দিকে। কি আশ্চর্য! গন্ধরাজ গাছটার সব থেকে উঁচু ডালটার কোলে পাতার মধ্যে একটা ফুলের কুঁড়ি, একটু একটু করে জেগে উঠছে! বেণুর মায়ের খুশিতে বুকটা ভরে উঠল। ভাবল টুনটুনি পাখিটা আসছে বলেই গন্ধরাজ গাছটার অভিমান ভেঙেছে; ইঁট-কাঠ পাথরের জঙ্গলেও ফুল ফুটিয়েছে!
বেণুর মায়ের মনে আনন্দ ধরে না। আহা তার আদরের নিঃসঙ্গ গন্ধরাজ গাছটার একটা বন্ধু জুটেছে। এবার সে অনেক ফুল ফোটাবে! দেখতে দেখতে সে দিন কেটে গেল। পরদিন বৃহস্পতিবার, বেণুর মা ভোরবেলা দালানের দরজা খুলেই তাকাল গন্ধরাজ গাছটার দিকে। কি আশ্চর্য! গন্ধরাজ গাছটার ডালে ডালে থরে থরে দু-তিনটে সাদা পদ্মের মতো গন্ধরাজ ফুল ফুটে আকাশকে অভিবাদন জানাচ্ছে! সারা উঠোনটা গন্ধরাজ ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা! আর সেই টুনটুনি পাখিটা, এই সকাল বেলাতেই হাজির হয়ে গেছে। পাঁচিলের উপর বসে মনের আনন্দে ডাকছে--‘টুই...টুই!’
বেণুর মা অবাক হয়ে দেখছে তাকে; কতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে ছিল চুপ করে বেণুর মা জানে না। হঠাৎ খেয়াল হলো--ঠাকুরকে ফুল-জল দিতে হবে যে। তাড়াতাড়ি গা-হাত ধুয়ে কাপড় ছেড়ে ঠাকুরকে ফুল- জল-বাতাসা দিতে গেল সে। গাছটার কাছে আসতেই টুনটুনিটা ফুড়ুৎ করে উড়ে পালালো। বেণুর মা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তার সাধের গন্ধরাজ গাছের কাছে।
পরদিন শুক্রবার, বেলা প্রায় দশটা! সকাল থেকেই বেণুর মা নজর রাখছিল গন্ধরাজ গাছটার দিকে। ফুলের ঐশ্বর্যে আর গন্ধে মাতোয়ারা গাছটাকে যেন নজর ছাড়া করতে চায়না বেণুর মা। সকালবেলা একটা গন্ধরাজ ফুল তুলে গোপালঠাকুরকে দেবে ভেবেছিল, কিন্তু ফুল তুলতে গিয়ে আর ফুল তুলতে পারছিল না। তার মনে হচ্ছিল, ফুলটা ছিঁড়লে গাছটার কষ্ট হবে! তাই অন্য ফুল দিয়েই সাজিয়ে দিল গোপালঠাকুরের বেদী!
পরের দিন শনিবার, সকাল হতেই আকাশের মুখটা ভার। হালকা মেঘের আনাগোনায় সূর্যিঠাকুরও কেমন যেন ম্রিয়মান। তবে টুনটুনিটার আসা-যাওয়ার বিরাম নেই। কোথা থেকে সাদা শিমূল তুলো ঠোঁটে করে এনে, সুন্দরভাবে সে সেলাই করছিল তার বাসাটা! দুপুরবেলা পাখিটা অনেকক্ষণ আসেনি! বেণুর মা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল তার সাধের গন্ধরাজ গাছটার দিকে। দেখল টুনটুনির বাসাটা কি সুন্দর দেখতে হয়েছে! বাসাটার মাথায় একটা বড় গন্ধরাজ পাতা, ছাতার মত রোদ-জল থেকে আড়াল করে রেখেছে টুনটুনির বাসাটাকে! বাসাটাও তৈরী হয়েছে সবুজ ঢলঢলে দুটো বড় বড় গন্ধরাজ পাতা সেলাই করে! বাসাটার মধ্যে সাদা শিমূল তুলোর নরম গদি, আর বাসার মধ্যে ঢোকার ফাঁকটুকু ছাড়া অন্য কোথাও একটুও ফাঁক নেই! বেণুর মায়ের মনে হলো গন্ধরাজ গাছটাও যেন টুনটুনির বাসাটাকে আড়াল করে রেখেছে পরম আদরে!
এদিকে বিকেল হয়ে আসছিল। পশ্চিমের আকাশ জুড়ে একটা কালো মেঘ বাতাসের তাড়নায় দূরন্ত গতিতে সূর্যকে আড়াল করে এগিয়ে এলো পূব আকাশের দিকে! ‘শোঁ...শোঁ...’ করে শব্দ উঠল যখন, বেণুর মা তাড়াতাড়ি জানলাগুলো বন্ধ করতে গিয়ে কাজের বৌকে বলল--‘নিশ্চয় কালবোশেখী হবে, তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাও বৌ।’
সারারাত ঝড় বৃষ্টিতে গাছপালাগুলোকে নাকাল করে পরদিন রবিবারের ভোর হলো সুন্দর আলো মাখা আকাশটাতে! বেণুর মা ভোর হতেই উঠে পড়েছে, দেখছে গন্ধরাজ গাছটাকে। না, কোন ক্ষতি হয়নি গাছটার! পাঁচিলটার আড়ালে সে দিব্যি দুটো ফুল ফুটিয়ে আনন্দে হাসছে! বাড়ির বাইরে অনেক গাছের ডালপালা ভেঙে গেছে, কাঁচা আম ঝরে গেছে, এমনকি বাইরের ফুলগাছগুলোও বেশ বিপর্যস্ত!
বেণুর মায়ের ঠাকুরকে দেওয়ার ফুল বেশী পাওয়া গেল না। তাই সেদিন অনিচ্ছা স্বত্বেও আদরের গন্ধরাজ গাছটা থেকেই একটা ফুল তুলতে হলো গোপালঠাকুরের পায়ে দেওয়ার জন্য! বেলা বাড়ছে, বেণুর মা লক্ষ্য রাখছিল গন্ধরাজ গাছটার দিকে। কিন্তু সেদিন আর এলো না টুনটুনি পাখিটা।
পরদিন সোমবারও এলো না পাখিটা! বেণুর মায়ের মতো গন্ধরাজ গাছটারও মন খারাপ। তার ডালে আজ কোন ফুল নেই! পাতাগুলোতেও যেন কোন জৌলুস নেই। একান্ত ম্রিয়মান হয়ে গেছে গাছটা!
পরদিন মঙ্গলবার ৩রা বৈশাখ। বেণুদের পাড়ায় বারোয়ারী কালীপুজোর মাইক বাজছে। বেণুর মাসীমারা আসছে বেণুর মায়ের আমন্ত্রণে! বেণুর মায়ের মনে খুব আনন্দ, বোনেরা আসছে এই বাড়িতে। শুধু একটা দুঃখ টুনটুনি পাখিটা আসছে না তার বাসায়। আর তাই গন্ধরাজ গাছটাও ফুল ফোটাতে পারছে না মনের দুঃখে!
বেলা দশটা, বেণুর মাসীমারা এসে পড়লো হৈ হৈ করে বেণুদের বাড়িতে। বেণুর মায়ের কী আনন্দ! বোনেরা এসেছে, বোনপো, বোনঝি এসেছে; এমনকি বোনঝির ছোট্ট ছেলেটাও এসেছে!
এমন সময় সেই মিষ্টি সুরটা আবার শোনা গেল-- ‘টুই...টুই...!’ বেণুর মা, বোনেদের সঙ্গে কথা বলা থামিয়ে, জানলায় উঁকি দিয়ে দেখল টুনটুনি পাখিটা এসে তার আদরের গন্ধরাজ গাছটার ডালে বসে ঠোঁট দিয়ে কতো আদর করছে গন্ধরাজ গাছটাকে! আর ডাকছে--‘টুই...টুই...’ করে! বেণুর মায়ের প্রাণটা খুশিতে ভরে উঠলো এই দৃশ্য দেখে।
পরদিন বুধবার, বেণুর মা লক্ষ্য রাখছিল পাখিটা এখন আর বেশি যাতায়াত করছে না। আর একটা সুন্দর বেগুনী রঙের টুনটুনি পাখিও এসে হাজির হয়েছে তার সাধের গন্ধরাজ গাছটার গায়ে পাঁচিলের উপরে! বেণুর মা বুঝলো এটা নিশ্চয় ছেলে টুনটুনি; মেয়ে টুনটুনিটার বন্ধু! মেয়ে টুনটুনিটা এখন বেশ গর্বের সঙ্গে তার বাসায় ঢুকছিল আর বাইরে বের হয়ে এসে--‘টুই...টুই...’ করে ডাকছিল!
পরদিন বৃহস্পতিবার; বেণুর মাসীমারা এখনো রয়েছে বেণুদের বাড়িতে। বেণুর মা তাই অনেক ভোরে উঠে বাড়ির পাঠ-ঝাঁট করে ঠাকুরের পুজো করবার জন্য উঠে পড়েছে। ঘরের দরজা খুলেই সে দেখলো তার আদরের গন্ধরাজ গাছটায় আবার দুটো ফুল ফুটেছে! আর সেই টুনটুনিটা তার বাসার মধ্যে থেকে ডাকছে--‘টুই...টুই...; টুই...টুই...!’
বেণুর মা বুঝলো নিশ্চয় টুনটুনিটা ডিম পেড়েছে, তাই বাসা থেকে আর বের হচ্ছে না! আর তাই গন্ধরাজ গাছটার আনন্দ আর ধরে না, সূর্যের আলোয়, আকাশের দিকে তার সুন্দর ফুল দুটিকে তুলে ধরে সে সূর্য প্রণাম করছে!