ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
মানুষের সভ্যতা যত এগিয়েছে, ততই যেন আমরা আমাদের প্রাচীনতম আশ্রয়, এই পৃথিবীকে একটু একটু করে ভুলে গেছি। অথচ আমাদের প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি খাদ্যকণা, প্রতিটি জলের ফোঁটা--সবই তো এই গ্রহেরই দান। সেই ঋণ স্বীকার করার দিনই হল আন্তর্জাতিক মাদার আর্থ ডে। প্রতি বছর ২২শে এপ্রিল বিশ্বজুড়ে এই দিনটি পালিত হয়, যেন মানুষ আবার ফিরে তাকায় নিজের ‘মা'-এর দিকে, পৃথিবীর দিকে।
পৃথিবীকে আমরা প্রায়শই একটি জড় গ্রহ হিসেবে দেখি; মাটি, জল, পাথর আর বায়ুর সমষ্টি হিসেবে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পৃথিবী জীবন্ত ও স্পন্দিত এক সত্তা। এর বুকে রয়েছে অগণিত প্রাণের বাস-ক্ষুদ্রতম অণুজীব থেকে শুরু করে বিশালাকৃতির প্রাণী পর্যন্ত। এই গ্রহের প্রতিটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত একটি বিশাল বাস্তুতন্ত্রের অংশ। প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে পৃথিবীকে ‘ধরিত্রী’বা ‘ভূমি দেবী' বলা হয়েছে। একইভাবে বিশ্বের নানা সংস্কৃতিতে পৃথিবীকে মা হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা যাকে বলি ইকোসিস্টেম, তার মর্মার্থ হল পৃথিবী আমাদের মা।
নীল এই গ্রহটি নিজেই এক জীবন্ত সত্তা; যে শ্বাস নেয়, প্রতিক্রিয়া করে, নিজেকে সামঞ্জস্য করে। তাহলে? এই বিস্ময়কর ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী জেমস লাভলক। তাঁর প্রস্তাবিত ‘গায়া তত্ত্ব’ আধুনিক পরিবেশবিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী চিন্তাধারা। এই তত্ত্বের মূল ধারণাটি হল অত্যন্ত সরল অথচ গভীর। পৃথিবীর জীবজগৎ এবং অজৈব উপাদান একত্রে এমন একটি সিস্টেম গঠন করে, যা নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং জীবনের উপযোগী পরিবেশ বজায় রাখে। এখানে ‘জীবন’কেবল বাসিন্দা নয়, বরং সক্রিয় নিয়ন্ত্রক। ধরা যাক, বায়ুমন্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ ২১ শতাংশ, সমুদ্রের লবণাক্ততা থাকে সর্বদা নির্দিষ্ট সীমায়, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা সব সময় প্রায় জীবনের উপযোগী। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য কেবল কাকতালীয় নয়। এই গায়া তত্ত্ব বলছে, এটি একটি সমন্বিত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার ফল। ১৯৬০-এর দশকে বিজ্ঞানী লাভলক কাজ করছিলেন নাসার সাথে। তাঁর লক্ষ্য ছিল মঙ্গলগ্রহে জীবনের সম্ভাবনা খুঁজে বের করা। এই সময় তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুললেন— ‘‘কোনো গ্রহে জীবন আছে কিনা, তা কীভাবে বোঝা যায়?’’ তিনি দেখলেন--মঙ্গল ও শুক্রের বায়ুমন্ডল স্থিতিশীল কিন্তু নিষ্প্রাণ। পৃথিবীর বায়ুমন্ডল অত্যন্ত অস্থিতিশীল, কিন্তু জীবনে ভরপুর। এই অস্থিতিশীলতাই জীবনের চিহ্ন, কারণ জীবজগৎ ক্রমাগত পরিবেশকে পরিবর্তন করছে। এই ভাবনা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর বিখ্যাত গায়া তত্ত্ব। পরে জীববিজ্ঞানী লিন মারগিউলিস এই ধারণাকে মাইক্রোবায়োলজির মাধ্যমে শক্তিশালী করেন।
এই তত্ত্বের শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে, যেমন ডেইজি মডেল। লাভলক একটি কাল্পনিক মডেল তৈরি করেন ও তার নাম দেন ডেইজি তত্ত্ব। এখানে দুটি ফুল, সাদা ডেইজি যা তাপ প্রতিফলিত করে ও কালো ডেইজি তাপ শোষণ করে। এই দুইয়ের ভারসাম্য পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এটি প্রমাণ করে--জীবজগৎ পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বায়োজিওকেমিক্যাল চক্র হল গায়া তত্ত্বের অন্যতম ভিত্তি; উদাহরণস্বরূপ কার্বন চক্র, নাইট্রোজেন চক্র ও জলচক্র। এই চক্রগুলো জীব ও অজীব উপাদানের মধ্যে এক অবিরাম সংলাপ তৈরি করে। এই তত্ত্ব কাল্পনিক নয় বরং এর বাস্তব উদাহরণও আছে। আমাদের এই পৃথিবীতে গায়ার উপস্থিতি আছে অ্যামাজন বনভূমি ও অন্যান্য স্থানে। এই বনভূমিকে বলে ‘পৃথিবীর ফুসফুস'। এটি বিপুল CO2 শোষণ করে, বৃষ্টিপাত নিয়ন্ত্রণ করে ও স্থানীয় ও বৈশ্বিক জলবায়ুকে স্থিতিশীল করে। এছাড়াও সমুদ্রের ক্ষুদ্র প্ল্যাঙ্কটন DMS গ্যাস উৎপন্ন করে। এই ডাইমিথাইল সালফাইড হল সমুদ্রের প্লাঙ্কটন থেকে নির্গত একটি প্রাকৃতিক সালফার গ্যাস, যা সমুদ্রের গন্ধের জন্য দায়ী এবং পৃথিবীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ও মেঘ তৈরিতে সাহায্য করে। এটি একটি বর্ণহীন, তীব্র গন্ধযুক্ত উদ্বায়ী জৈব যৌগ, যা জলবায়ু শীতলকরণে ভূমিকা রাখে এবং শিল্পক্ষেত্রে ইথিলিন উৎপাদনেও ব্যবহৃত হয়। মাটির অণুজীব তথা ব্যাকটেরিয়া নাইট্রোজেনকে উদ্ভিদের উপযোগী করে তোলে, এটি ছাড়া জীবন অসম্ভব। প্রকৃতপক্ষে গায়া তত্ত্ব শুধু বিজ্ঞান নয়, এটি এক ধরণের দর্শনও। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষ প্রকৃতির শাসক নয় বরং আমরা একটি বৃহত্তর সিস্টেমের অংশমাত্র। তবে গায়া তত্ত্ব শুরুতে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। সমালোচনার মূল পয়েন্ট ছিল পৃথিবী কি সত্যিই ‘সচেতন'? প্রাকৃতিক নির্বাচন কি পুরো গ্রহে কাজ করতে পারে? আধুনিক বিজ্ঞানীরা এখন ‘উইক গায়া’ধারণা মেনে নেন। তাদের মতে, পৃথিবী সচেতন নয়, কিন্তু এটি একটি স্বনিয়ন্ত্রিত জটিল এক সিস্টেম। এই ধারণা এখন ‘আর্থ সিস্টেম সায়েন্স’-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। সর্বোপরি লাভলকের এই তত্ত্ব আমাদের শেখায়-পৃথিবী কোনো যন্ত্র নয়, এটি একটি জীবন্ত সমন্বয়। আমরা এই সিস্টেমের অংশ, এর উপর নির্ভরশীল। তাই এই গায়া তত্ত্ব শুধু একটি বৈজ্ঞানিক ধারণা নয় এটি মানবজাতির জন্য একটি নৈতিক বার্তাও।
আন্তর্জাতিক মাদার আর্থ ডে-এর ইতিহাস বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৭০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আর্থ ডে পালিত হয়, যার নেতৃত্ব দেন গেলর্ড নেলসন। তিনি ছিলেন একজন পরিবেশ সচেতন সিনেটর, যিনি শিল্পায়নের ফলে পরিবেশের ক্ষতির বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়াতে চেয়েছিলেন। তিনি আমেরিকার ইতিহাসে এক বিরল রাজনীতিবিদ। পরবর্তীকালে তাঁর এই আন্দোলন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৯ সালে ইউনাইটেড নেশনস বা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ আনুষ্ঠানিকভাবে ২২শে এপ্রিলকে ‘আন্তর্জাতিক মাদার আর্থ ডে’হিসেবে ঘোষণা করে। এই নামকরণটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষার কথা বলে না, বরং পৃথিবীর সঙ্গে মানুষের আবেগগত সম্পর্কের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। আজকের পৃথিবী নানা সংকটের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, বায়ুদূষণ, জলদূষণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এই সমস্ত সমস্যা আমাদের অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বর্তমানে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। হিমবাহ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং চরম আবহাওয়া (ঝড়, খরা, বন্যা) বেড়েই চলেছে। এর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়াও, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে। বন শুধু অক্সিজেনের উৎস নয় বরং এটি হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণীর আবাসস্থলও। বনভূমি নষ্ট হলে সেই প্রাণীদের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়। প্রতিদিন অসংখ্য প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, যাদের অনেককেই আমরা কখনও চিনতেই পারিনি। এই ক্ষতি শুধু প্রকৃতির নয়, মানুষেরও। প্লাস্টিক, শিল্পবর্জ্য, বিষাক্ত গ্যাস--সব মিলিয়ে পৃথিবীর বায়ু, জল ও মাটি আজ দূষিত। এই দূষণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। মানুষই যেমন এই সমস্যার প্রধান কারণ, তেমনি মানুষই পারে এর সমাধান করতে। আমরা যখন নির্বিচারে গাছ কাটছি, নদী দূষিত করছি, অতিরিক্ত ভোগবাদে মত্ত হচ্ছি— তখন আমরা প্রকৃতির সঙ্গে আমাদেরই সম্পর্ককে ধ্বংস করছি। কিন্তু একই সঙ্গে, আমরা যদি সচেতন হই, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব।
গাছ লাগানো, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস ব্যবহার করা, জল সংরক্ষণ; অপ্রয়োজনীয় জল অপচয় বন্ধ করা। নবায়নযোগ্য শক্তি যেমন— সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ইত্যাদির ব্যবহার বাড়াতে হবে। মানুষকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসা শুধু বিজ্ঞানের বিষয় নয়। আজকের যুগ প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি যেমন পরিবেশের ক্ষতি করেছে, তেমনি এটি সমাধানের পথও দেখাতে পারে। স্মার্ট সিটি, গ্রিন এনার্জি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এসবই আমাদের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করতে সাহায্য করতে পারে যদি আমরা তাদের সঠিকভাবে ব্যবহার করি। এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের শিশু ও তরুণদের ওপর। তাদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। স্কুলে পরিবেশ শিক্ষা, প্রকৃতির সঙ্গে সরাসরি পরিচয়, গাছ লাগানোর কর্মসূচি— এসব উদ্যোগ শিশুদের মধ্যে পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে পারে।
ভারতবর্ষ মুনি ঋষিদের দেশ। এখানে তপোবনের ধারণা থেকেই আজকের স্যাংচুয়ারি, ন্যাশনাল পার্ক ও বায়োডাইভারসিটি রিজার্ভের মতো অরণ্যের সৃষ্টি হয়েছে। এই গুলিতে বিভিন্ন প্রাণীরা নির্ভয়ে বিচরণ করতে পারে। ভারতে পরিবেশ রক্ষার এক সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে। বিষ্ণোই আন্দোলন, চিপকো আন্দোলন, সাইলেন্ট ভ্যালি মুভমেন্ট ও নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন— এসব আন্দোলন মানুষের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়িয়েছে। সুন্দরলাল বহুগুণা ছিলেন চিপকো আন্দোলনের অন্যতম নেতা। তিনি দেখিয়েছেন, সাধারণ মানুষ বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
মাদার আর্থ ডে এটা কেবলমাত্র একটি দিন নয়। এটি একটি প্রতীক দিবস। আসল কাজটি করতে হবে প্রতিদিন। আমরা যদি বছরে একদিন পৃথিবীর কথা ভাবি, আর বাকি দিনগুলোতে তাকে ধ্বংস করি, তাহলে এই দিনটির কোনো অর্থ থাকে না। পৃথিবী আমাদের কাছে কিছু চায় না— সে শুধু দেয়। কিন্তু এখন সময় এসেছে, আমরা তার প্রতি আমাদের দায়িত্ব পালন করি। চলুন আমরা প্রত্যেকে ছোট-ছোট প্রতিশ্রুতি নিই— আমি একটি গাছ লাগাবো, আমি প্লাস্টিক কম ব্যবহার করবো, আমি জল ও বিদ্যুৎ সঞ্চয় করবো, আমি অন্যদেরও সচেতন করবো। এই ছোট ছোট পদক্ষেপই একদিন বড় পরিবর্তন আনবে। অতি আধুনিক সময়ে, ডিপ ও শ্যালো ইকোলজি তত্ত্বের জন্ম হয়েছে। শ্যালো ইকোলজি আমাদের বাঁচতে শেখায়, ডিপ ইকোলজি আমাদের সঠিকভাবে বাঁচতে শেখায়। মা পৃথিবী আজ আমাদের কাছে সাহায্য চাইছে। তার নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে, বনগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, প্রাণীরা বিলুপ্ত হচ্ছে। এই সংকটের সময়ে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে— আমরা কি ধ্বংসের পথে হাঁটবো, নাকি পুনর্জাগরণের পথে আন্তর্জাতিক মাদার আর্থ ডে আমাদের সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন করা শুধু কর্তব্য নয়, এটি ভালোবাসার এক প্রকাশও। চলুন, আমরা পৃথিবীকে আবার ভালোবাসতে শিখি। শেষ কথা— ‘প্রকৃতি আমাদের সম্পত্তি নয়; আমরা প্রকৃতির অংশ।’