ছোটদের কথা
ছোটদের কথা
সঃ ছোঃ কঃ
জন্ম : ১০.০২.১৭৭৫
মৃত্যু : ২৭.১২.১৮৩৪
জন্ম : ০৩.১২.১৭৬৪
মৃত্যু : ২০.০৫.১৮৪৭
দিদি ও ভাইয়ের সম্মিলিতভাবে বলা উইলিয়াম শেক্সপীয়রের চিরচেনা গল্পগুলি কিশোরদের উপযোগী করে বলার গুণে ইংরেজী সাহিত্যে একটি উজ্জ্বল সংস্করণ রূপে আজও আদৃত। বইটির নাম ''টেলস ফ্রম শেক্সপীয়র''। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই এই সংস্করণটি দুশো বছর পেরিয়েছে কবেই। এই বইটির কথক চার্লস ল্যাম ও মেরি ল্যাম।
চার্লস ল্যাম অত্যন্ত রুগ্ন শরীরে এক হতদরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন সামান্য কেরাণী এবং তাঁর উপার্জন ছিল খুবই নগণ্য। মা ছিলেন ধনী পরিবারের কন্যা কাজেই হতদরিদ্র পরিবারে তিনি কিছুই মানতে বা মানাতে পারেন নি। প্রথম সন্তান উইলিয়ামকে নিয়ে ছিল তাঁর অভিজাত জীবনযাত্রা। স্নেহ, ভালবাসা বা মায়ের আদরযত্ন কোনটাই এই দুই ভাইবোনের ভাগ্যে জোটেনি। একমাত্র পিসীমাই ছিলেন তাঁদের অভিভাবক। তাঁর বলা গল্প এবং আদরযত্ন ছিল দুই ভাইবোনের মরুভূমিতে মরুদ্যানের মত।
প্রথম যে দুই স্কুলে চার্লস ভর্তি হন সে দুই স্কুল মোটেই আভিজাত্যে এবং কৌলিন্যে দড় ছিল না। তার উপর জন্ম থেকে রোগে ভোগা চার্লস ছিলেন তোতলা, কাজেই এই দুই স্কুলে তার কোন বন্ধু অবধি হয়নি। তৃতীয় যে স্কুলটিতে চার্লস ভর্তি হন— সে স্কুলটি চার্লসের মনোমত হয় এবং এই প্রথম চার্লস তার জীবনে প্রথম বন্ধু খুঁজে পায় এবং এই বন্ধুত্ব তার জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বজায় থাকে।
এই বন্ধু ছিলেন স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ। তাঁদের স্কুলের নাম ছিল ক্রাইস্ট স্কুল। এই স্কুল ছিল দুই বন্ধুর মনোমত। এই স্কুলে পড়াকালীন কোলরিজের কবিতা লেখার খ্যাতি হয়। ক্রাইস্ট স্কুলে একটা নিয়ম ছিল যে কোন ছাত্রের লেখা কবিতা যদি কোন শিক্ষকের ভাল লাগত তাহলে তা একটি মোটা বাঁধানো খাতায় লেখা থাকত। কোলরিজের বেশ কয়েকটি কবিতা সেই খাতায় লেখা ছিল। আগ্রহী চার্লস অনেক দ্বিধার পর তাঁর লেখা একটি কবিতা দেখান। শিক্ষক চার্লসের কবিতা স্কুলের খাতায় তোলার যোগ্য বলে জানালে--মুখচোরা চার্লস অত্যন্ত প্রীত হন। দ্বিগুণ করে স্কুলকে ভালবেসে ফেললেন চার্লস। কিন্তু বিধি বাম। আর্থিক কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হলেন চার্লস। কেননা তাঁর বাবা ভেবেছিলেন--চার্লস তো তোতলা, তাই তাঁর পক্ষে বাগ্মিতা প্রয়োজন এমন কোন পেশায় যাওয়া সম্ভব হবে না। সর্বোপরি চার্লসের বাবার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না--ছেলে, মেয়ে, বোনকে নিয়ে মোটামুটি একটা বড় সংসার টানার--সংসার চালাতে অর্থের প্রয়োজন; তাই মাত্র পনের বছর বয়সে সওদাগরী অফিসে; ‘সাউস সি হাউসে' চাকরি নিতে বাধ্য হলেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর লন্ডনের অফিস ইস্ট ইন্ডিয়া হাউসে ভারতের সঙ্গে ব্যবসার হিসাব রাখার দফতরে কেরানিগিরি। রোজগারের অত্যন্ত প্রয়োজন। সংসার খরচ চালাবার জন্য টাকার প্রয়োজন। তার উপর আছে অসুস্থ বোনের চিকিৎসার খরচ। চিকিৎসা আবার যে সে চিকিৎসা নয়--মানসিক চিকিৎসা, যা ছিল তখনকার দিনে অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
তৎসত্ত্বেও তিনি লেখা ছাড়েন নি। কয়েকটি সাময়িক পত্রে ইতস্ততঃ কবিতা ছাপা হয়। কোলরিজ, ওয়ার্ডস ওয়ার্থ, ডরোথি, ক্র্যাব, হ্যাজলিট, গডউইন প্রমুখের সঙ্গে চলেছিল তাঁর পত্রালাপ।
এই সময়ে তাঁর লেখা ''দ্য টেল অফ রোডমেন্ড গ্রে অ্যান্ড ওল্ড ব্লাইন্ড মার্গারেট''--বইটা খুব ভাল লেগেছিল শেলীর। এর পর আর একটি নাটক লিখেছিলেন চার্লস, সেকালের বেশ কয়েকটি নাট্যকোম্পানীকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ফিরে এল সব জায়গা থেকেই। শেষমেষ নিজের খরচে ছাপাতে দিয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর নতুন করে লেখা বা কিশোর উপযোগী করে লেখা ''টেলস ফ্রম শেক্সপীয়র'' ফিরে আসে নি। এখানে বলে রাখা ভাল যে শেক্সপীয়রের নাটক গুলি থেকে গল্পগুলি লিখতে তাঁকে অণুপ্রাণিত করেছিলেন শেলির শ্বশুরমশাই উইলিয়াম গডউইন। স্বর্ণহৃদয় ভাই একাজে জড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর বোন মেরী উইলিয়ামসকে। মেরী লিখেছিলেন মোট চোদ্দটি কমেডি আর চার্লস ছয়টি ট্রাজেডি। ১৮০৭ সালে এই বইয়ের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। পুনর্মুদ্রণ আজও চলেছে।
আমি ''ছোটদের কথা'' পত্রিকার পাঠক-পাঠিকাদের জন্য ছয়টি ট্রাজেডি অর্থাৎ বিয়োগান্তক নাটক একে একে অনুবাদ করে যাব। এই বিয়োগান্তক নাটকমালার ''ম্যাকবেথ''-এর পরের সংখ্যায় অনুবাদ করব। তোমাদের ভাল লাগলে তার পর পর অন্যান্যগুলি।
প্রথম পর্ব
মহামতি ডানকান ছিলেন সেসময় স্কটল্যান্ডের সম্রাট। মহামতি ডানকানের অধীনে বহু জমিদারদের মধ্যে একজন ছিলেন সম্রাটের নিকট আত্মীয় এবং অতি প্রিয়। নাম ছিল তাঁর ম্যাকবেথ। ডানকানের কাজের মানুষ ম্যাকবেথ, তাঁর যুদ্ধকৌশল এবং বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য অত্যন্ত খ্যাত ছিলেন। ইদানীং কালে এমনই একদল বিদ্রোহীদের নিঃশেষে দমন করে ম্যাকবেথ তাঁর শৌর্য প্রদর্শনের শিখরে উঠেছিলেন। সেই বিদ্রোহী দলের পক্ষে ছিলেন নরওয়ের রাজার সৈন্যদল যাঁরা সংখ্যায় একশো-দুশো জন নয় বরং সংখ্যায় কয়েক হাজার।
দুজন বিজয়ী জেনারেল ম্যাকবেথ এবং ব্যাঙ্কো যুদ্ধজয়ের পর ফিরে আসছিলেন স্কটল্যান্ডে। তাঁদের পথে পড়েছিল এক বিশাল টাঁড় (রুক্ষ্মভূমি)। তাঁদের পথ ঘিরে দাঁড়াল--তিনজন অদ্ভুত দেহী। আপাতদৃষ্টিতে তাদের নারী মনে হলেও তাদের মুখে ছিল অদ্ভুত দাড়ি। তাদের পোশাকের কোন ছিরিছাঁদ নেই--যেন কোন প্রাচীনকালের ছাল বাকল দিয়ে তৈরী হয়েছে তাদের পোশাক, পোশাকের নীচে হাড্ডি সর্বস্ব দেহ খসখসে চামড়া দিয়ে জড়ানো। সেই অদ্ভুত দর্শন জীবেরা সরু সরু আঙুল তুলে চোপসানো ঠোঁটে ঠেকিয়ে এমন ভঙ্গি করল যাতে বোঝায়, একদম চুপ। তিনজনের দলের প্রথমজন ম্যাকবেথকে অভিবাদন করে বলল--''জয়ী হোক ম্যাকবেথ গ্লামিসের মেন'' অর্থাৎ কিনা জমিদার। ম্যাকবেথ এমন অভিবাদন পেতে অভ্যস্ত তাই তাঁর বিশেষ কিছু মনে হল না। দ্বিতীয়জন বলল, ‘‘জয় হোক ম্যাকবেথের যিনি কডর প্রদেশের জমিদার।'' তারপর সবাইকে চমকে দিয়ে তৃতীয়জন সরাসরি স্কটল্যান্ডের মহারাজ বলে ম্যাকবেথকে অভিবাদন জানাল। ম্যাকবেথ এই অভিবাদনে প্রীত হলেও মজাও পেলেন খানিকটা। কারণ তিনি জানতেন স্কটল্যান্ডের মহারাজা মহামতি ডানকান এখনও জীবিত এবং তিনি যথেষ্ট প্রজানুরঞ্জক। এছাড়া আছে: সম্রাট ডানকানের দুই ছেলে--ম্যালকম ও ডোনালবেন। কাজেই ম্যাকবেথের আর রাজা হওয়ার সুযোগ কোথায়?
এইভাবে ম্যাকবেথকে চিন্তামগ্ন করতে পেরে সেই অদ্ভুতদর্শন তিন বোন এবার ব্যাঙ্কোর দিকে ফিরে একসঙ্গে বলল--''তুমি রাজা না হয়েও হবে রাজার চেয়ে বড়। তুমি কোনদিন স্কটল্যান্ডের সিংহাসনে বসতে পারবে না--তোমার ছেলেরা হবে স্কটল্যান্ডের রাজা। তুমি হবে পৃথিবীর সুখীতম মানুষ।'' এইভাবে ব্যাঙ্কোকে এক ধাঁধার মধ্যে রেখে--তিন বোন বাতাসে মিলিয়ে গেল। তিনবোনকে বাতাসে মিলিয়ে যেতে দেখে ম্যাকবেথ ও ব্যাঙ্কো দুজনেই বুঝতে পারলেন--এই তিন বোন ডাইনী ছাড়া আর কিছু নয়--আর ডাইনীদের বিশেষ বিশেষত্ব এই যে তারা কখনও সোজা, সরল, সত্য কথা বলে না। তারা সর্বদা এক কথার আড়ালে আর এক কথা বলে থাকে। তারা কথার মার প্যাঁচে মানুষকে বিভ্রান্ত করে থাকে। এটাই ওদের মায়া।
ম্যাকবেথ এবং ব্যাঙ্কো যখন দুজনে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে ডাইনীদের বলে যাওয়া কথাগুলো ভাবছেন তখন পূবে ঘোড়া ছুটিয়ে দুজন অশ্বারোহীকে আসতে দেখা গেল। দুরন্ত বেগে অশ্বারোহী দুজন তাঁদের দুজনের কাছে এসে আভূমি নত হয়ে কুর্ণিশ করে জানালেন--সম্রাট ডানকান ম্যাকবেথকে কডরের মেন অর্থাৎ কডরের জমিদারি প্রদান করেছেন। অপরজন অশ্বারোহী ম্যাকবেথের হাতে একটি গোটানো পেপার যা কিনা সনদ দিলেন যাতে লেখা আছে কডরের রাজার সদ্যপ্রাপ্ত মালিকানা। ম্যাকবেথ কডরের মেন হওয়ার খবর পেয়ে অত্যন্ত আনন্দিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যার পর নাই অবাক হলেন-- আরও অবাক হলেন ডাইনীর ভবিষ্যৎবাণী ফলে যাওয়ার জন্য। তার সঙ্গে আশা জাগল তৃতীয় ডাইনীর ভবিষ্যৎবাণীর সম্পর্কে। মনে মনে ম্যাকবেথ বার কয়েক উচ্চারণ করলেন--''সম্রাট ম্যাকবেথ, সম্রাট ম্যাকবেথ''--এই অভিব্যক্তি ম্যাকবেথের এতটাই পছন্দ হল যে মনে মনে তিনি চনমনে হয়ে উঠলেন। সামনে ব্যাঙ্কোকে প্রশ্ন করলেন-''আপনি কি মনে করেন আপনার সন্তানেরা স্কটল্যান্ডের সম্রাট হবে যখন আমাকে বলা ডাইনীদের ভবিষ্যৎবাণী এভাবে ফলে গেল।'' ব্যাঙ্কো অত্যন্ত সৎ উত্তর দিলেন--''আপনার ক্ষেত্রে ডাইনীদের বলা ভবিষ্যৎ বাণী ফলে গেছে-- এই আংশিক ফলে যাওয়া ভবিষ্যৎবাণী আপনাকে ভবিষ্যতের দিকে আরও আশান্বিত করে তুলেছে। আপনি আশা করতে পারেন যে আপনি সম্রাট হবেন তবে মনে রাখবেন--এই আঁধার জগতের অধিবাসীরা কখনও সত্যি কথা বলে না--তাদের সকল উক্তিই লোক-ঠকানোর জন্য।'
কিন্তু ম্যাকবেথের মনে এই ডাইনীদের ভবিষ্যৎবাণী এতটাই ছাপ ফেলেছিল যে তিনি স্কটল্যান্ডের রাজাধিরাজ হবেন একথা মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিলেন না। ব্যাঙ্কোর ভাল কথা অগ্রাহ্য করে তাঁর মনে কেবলই ঘোরাঘুরি করছিল--''আমি হব সম্রাট রাজাধিরাজ।'' সেই সঙ্গে তাঁর মনে আর দুটি প্রশ্ন ঘোরাঘুরি করছিল--‘‘কিভাবে?’’ ‘‘কবে?’’ কিন্তু এই দুই প্রশ্নের কোন সদুত্তর তিনি মাথা খোঁড়াখুড়ি করেও পাচ্ছিলেন না। তার মনে দুটি প্রশ্ন ক্রমাগত কুঠারাঘাত করে চলছিল ‘‘কবে?’’ ‘‘কিভাবে?’’